বিদ্যুতে ভুতুড়ে বিলের শেষ কোথায়

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫২ এএম

তিন কামরার এক ফ্ল্যাট। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) সংখ্যা চারটি। প্রতিটির ক্ষমতা দেড় টন। একজন উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে যেসব বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ থাকার কথা, এখানেও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে বিদ্যুৎ বিল যদি আসে ৬৫ হাজার ৪৫৭ টাকা ৪২ পয়সা, তাহলে যে কারও মাথা ঘুরে যেতে পারে। হয়েছেও তাই।

নাট্যকার, নির্মাতা, স্থপতি শাকুর মজিদের রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের তিন কামরার অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের এ খবর জানান গতকাল শনিবার নিজের এক ফেসবুক পোস্টে। সেখানে তিনি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

নাট্যাভিনেত্রী মৌ শিখা দুই দিন আগে তার ফেসবুক পোস্টে উত্তরার বাসায় অস্বাভাবিক বিল আসার বিষয়ে অভিযোগ করেন।

শাকুর মজিদ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর গ্রাহক। তার বাসার গত বছর মে থেকে আগস্ট এবং চলতি বছর একই সময়ের বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহ করে দেখা গেছে, একই বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশে ৬৫ হাজার ৪৫৭ টাকা ৪২ পয়সার বিলটি অস্বাভাবিক।  ঢাকার আরেক বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)-তে যোগাযোগ করে মৌ শিখার ফ্ল্যাটের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাসের বিলের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেখানেও একই সময়ে দুই বছরে দুই রকম বিলের তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এই সময়ের মধ্যে গত জুনে গড় খুচরা বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত দামে বিল করা হলেও তা এতটা বাড়ার কথা নয়।

শাকুর মজিদ জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিনি অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে বিস্মিত হন। তিনি তার প্রকৌশলী বন্ধুদের তার বাসার বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের তালিকা পাঠালে তারা তাকে জানিয়েছেন, এসব যন্ত্রাংশের সবগুলো প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা করে চালানো হলেও ৩০ দিনে এই বিল আসা সম্ভব নয়। নিউ স্কাটনের যে বাসায় তিনি থাকছেন, এটি তার নিজের ফ্ল্যাট। তবে এখানে যারা ভাড়া থাকেন, তারা ৪০ হাজার টাকায় ভাড়া থাকছেন। বাসা ভাড়ার দেড়গুণ বিদ্যুৎ বিল এসেছে।

ডিপিডিসি থেকে শাকুর মজিদের বিল সংগ্রহ করে দেখা গেছে, গত বছর মে মাসে তার বিল ছিল ১২ হাজার ৫৪২ টাকা, চলতি বছর একই মাসে যা ছিল ১৫ হাজার ৬৭২ টাকা। একইভাবে গত বছর জুনে ১৩ হাজার ৪১৭ টাকা, চলতি বছর যা ৫ হাজার ১৩৪ টাকা; গত বছর জুলাই মাসে ১৭ হাজার ৮২১ টাকা, চলতি বছর জুলাই মাসে ১২ হাজার ৫৯০ টাকা এবং গত বছর আগস্টে বিল ছিল ১৮ হাজার ২১৮ টাকা, চলতি বছর একই সময়ে এসেছে ৬৫ হাজার ৪৫৭ টাকা। কোনো কারণে নির্ধারিত তারিখের পর পরিশোধ করা হলে তা হবে ৬৮ হাজার ৫৭৫ টাকা।

তথ্য নিয়ে জানা গেছে, মৌ শিখার বাসার বিদ্যুতের সংযোগটি ৩ কিলোওয়াটের। সংশ্লিষ্টদের মতে, চাইলেও এই তিন কিলোওয়াট লোড দিয়ে অনেক কিছু একসঙ্গে চালাতে পারার কথা নয়। সংগৃহীত তথ্য অনুসারে গত বছর ২০২৫ সালে এপ্রিলে ৭ হাজার ৫২৫ টাকা, মে মাসে ৯ হাজার ৪২৭ টাকা, জুন মাসে ১১ হাজার ৫৪৪ টাকা, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৩৩৩ টাকা এবং আগস্ট মাসে বিল আসে ৯ হাজার ১২১ টাকা। চলতি বছর এপ্রিলে বিল আসে ৬ হাজার ১৪৫ টাকা, মে মাসে ৭ হাজার ৭৮৬ টাকা, জুনে ১৬ হাজার ৭৭২ টাকা, জুলাই মাসে ১৪ হাজার ৭৭০ টাকা এবং আগস্টে বিল আসে ১৭ হাজার ৯১১ টাকা।

মৌ শিখার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বাসাভাড়া ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে সার্ভিস চার্জ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূল ভাড়া ২৩ হাজার টাকা। গত আগস্ট মাসে ২৩ হাজার টাকার বাসায় ১৭ হাজার ৯১১ টাকা বিল এসেছে। তিনি এই বিলকে অস্বাভাবিক বলে পোস্ট দেওয়ার পর বিতরণ কোম্পানির পক্ষ থেকে গিয়ে তাকে বোঝানো হয়েছে, এই বিল ঠিক আছে। তিনি একা শুধু নন, তিনি যে বাড়িতে থাকেন, সেখানে সবারই এমন বিল এসেছে। বিতরণ কোম্পানি গিয়ে বলেছে, এই বিলই ঠিক আছে। তাদের বিষয়টি মেনে নিতে হয়েছে। তিনি এখন বাসা বদলানোর চেষ্টা করছেন। মনে করছেন, যেখানে প্রিপেইড মিটার রয়েছে, সেখানে গেলে এই বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণা থেকে বাঁচবেন।

শাকুর মজিদ কিংবা মৌ শিখা নয়, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এমন বিড়ম্বনার খবর হরহামেশাই প্রকাশিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয়কে গুরুত্বসহকারে দেখছে বলার পরও এমন ঘটনা প্রায় কেন ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কোম্পানিগুলোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ধারা চালুর পর থেকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একজন গ্রাহক যখন ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তখন তার বিদ্যুতের দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়। ৬০০ ইউনিটের ওপরে যদি কোনো গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে তাকে প্রতি ইউনিট ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা দরে পরিশোধ করতে হয়। অন্যান্য মাসে ৩০ দিনের বিল করা হলেও মে এবং জুন মাসে বিলিং সাইকেল ৪০ দিনের করে দেওয়া হয়। এতে বড় গ্রাহক ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীর ধাপে চলে যায়। বিল প্রস্তুত থেকে শুরু করে বিতরণে যে ১০ দিন সময় প্রয়োজন হয়, কৌশলে এই সময়কে বিলিং মাসের মধ্যে ঢোকানো হয়। গ্রাহক চ্যালেঞ্জ করেও অনেক সময় কিছু করতে পারেন না। সহজ ভাষায় বললে, গ্রাহকের ৪০ দিনের বিল ৩০ দিনে হিসাব করে দিতে বাধ্য করা হয়। আর বাড়তি এই অর্থ দিয়ে সিস্টেম লস, বিদ্যৎ চুরি সব কিছুকে জায়েজ করা হয়। মোটামুটি এই প্রক্রিয়া গ্রাহকের গা সওয়া হয়ে গেছে। জুনের পর থেকে আবার বিল কম আসতে শুরু করে। তবে এবার জুলাই-আগস্টে এসেও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ধাক্কা খাচ্ছেন গ্রাহক।

সম্প্রতি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেন। অশালীন ওই ভিডিও প্রকাশের পর পুলিশ সিফাত আবদুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করেছে। তবে এই ঘটনার পর সিফাত আবদুল্লাহর অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গত তিন মাসের লঙ্কাকাণ্ডের পর বিদ্যুৎ বিভাগ এ বিষয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলে, কারও বেশি বিল এলে বিষয়টি নিয়ে বিতরণ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। করলেই এসব বিষয় ঠিক করে দেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বিদ্যুৎ বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে ৬ জুলাই বলেন, বিদ্যুৎ বিল বাড়ার প্রধান কারণ মিটারের ত্রুটি নয়। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, গ্রাহকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া এবং উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যাওয়ার কারণে অনেকের বিল বেড়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুলও পাওয়া গেছে। সেসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় প্রতিকার দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে কখনো কখনো সমস্যায় পড়তে হয়।

শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের সংবাদ সম্মেলন নয়, বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপরও কেন সমাধান হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি প্রশাসনের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এটি তার প্রমাণ। এটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান সরকার কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না কেন, তা খুঁজে বের করা উচিত। এখানে জ্বালানি প্রশাসন সরকারকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, নাকি সরকার তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তার বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। এটি দেখার দায়িত্ব ভোক্তা অধিদপ্তরের এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর। কিন্তু এই দুই প্রতিষ্ঠানই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে না বলে তিনি মনে করেন।

এসব বিষয়ে বক্তব্যের জন্য বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত