স্বল্প আয়ের মানুষের মানসম্মত আবাসন নিশ্চিতে কাজ করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। সম্প্রতি গ্রাহক ভোগান্তি কমানোসহ জনবান্ধব নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কমই আলোচনা হচ্ছে। সবকিছু ছাপিয়ে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম-দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। এসব খবরের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই সাময়িক বরখাস্ত হচ্ছেন অনেকেই। যদিও অভিযোগ প্রমাণ না পাওয়ায় আবার চাকরি ফেরত পাচ্ছেন তারা। তবে এসব বিশৃঙ্খলায় সংস্থাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের পরিবারের পুনর্বাসনে সরকার ‘৩৬ জুলাই’ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে জাগৃক। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। রাজধানীর মিরপুর সেকশন-১৪ এর পুলিশ লাইনস-সংলগ্ন এলাকায় জাগৃকের নিজস্ব ৫ দশমিক ৮ একর জমির ওপর এই আবাসন কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের আওতায় শহীদ পরিবারগুলোর স্থায়ী বাসস্থানের জন্য মোট ৮০৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে এক হাজার ৩৫৫ বর্গফুট। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই আবাসন প্রকল্পে মোট ১৮টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে, যার মধ্যে ছয়টি ভবন ১৪তলা এবং ১২টি ভবন ১০তলা হবে।
তবে এসব কিছু ছাপিয়ে বরাবরই আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। ভালো পোস্টিং, প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক বলয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এসব তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেবাদানকারী সংস্থা হিসেবে সুনামও ক্ষুণœ হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন এক অভিযোগের শিকার হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার দাবি করেছেন জাগৃকের অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহীন। তার দাবি, আমি পদবি পরিবর্তনপূর্বক অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে হিসাব সহকারী পদের পরিবর্তে অফিস সহকারী পদে পদায়ন হই। এতে কোনো রূপ অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হয়নি। তারপরও এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে প্রায় এক বছর চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাখা হয়েছিল। পরে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় গত ১৬ আগস্ট তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
মোস্তফা কামাল শাহীনের ভাষ্য, ‘তাকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, দুদকের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি, ব্যবসার জন্য একাধিক পাসপোর্টধারী এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক এমন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি দুদকের কোনো মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি নই। আমি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রও ছিলাম না। একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। পরে তারাই দুদকে অভিযোগ দিয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।’ গৃহায়নে সেলিম শাহনেওয়াজ, অফিস সহকারী শওকত হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে ‘সিন্ডিকেট’-এর যে অভিযোগ প্রচার করা হয়েছে, সেটিও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে গত ১৩ জুলাই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই সময় অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। কেউ কেউ ওই বদলির আদেশকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বলেও অভিহিত করেন। যদিও বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভালো ইমেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করেন, একসময় সেবাগ্রহীতাদের প্লট ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘদিন ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হতো। অনিয়মের মাধ্যমে একজনের প্লট অন্যজনকে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও ছিল। বর্তমানে এসব অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে পুনর্বাসন প্লটের ক্ষেত্রে অধিকতর যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে বিশেষ সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রতিষ্ঠানটির তরফ থেকে বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢাকার বাইরে বদলি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, শাহীনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটির কাছে সেটা যথাযথভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বিভাগীয় মামলা তুলে নিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ রহিত করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি সিন্ডিকেট কাজ করে। তারা কোনো ভালো কাজ, ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতা করে না। ওই সিন্ডিকেট ভাঙতে আমি কাজ করছি। অনেকটা সফলও হয়েছি। সংস্থার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি সহজ করাসহ বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।