কাশবনের সাদা তারাফুল

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৫ এএম

শরতের এমন সকাল হবে ভাবিনি। ভেবেছিলাম, শরতের সকালটা উজ্জ্বল রোদ নিয়ে হেসে উঠবে, আকাশটা হবে নীল। আকাশের সাদা মেঘের সঙ্গে মাটির সাদা কাশফুলের মিতালি হবে, খুনসুটিও হবে। সে আশাতেই এ বছর ১২ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টায় ঢাকার ঘর থেকে বেরিয়ে পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার মতো ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির হলাম নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বাজারের ঘাটে। মাঝে শীতলক্ষ্যা নদী, ওপারে গাজীপুরের কালীগঞ্জ। কিন্তু তখনো আকাশটা ঘোলাটে, নীলের দেখা নেই। একটু আগে কয়েক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। তা হোক। নদীর ওপারের কাশবনটা যে ফুলে ফুলে সাদা। সেখান থেকে একটা ছোট্ট নৌকায় নদী পেরিয়ে হাজির হলাম সে পাড়ের বিস্তীর্ণ কাশবনে। মাতাল হাওয়ায় কাশফুলগুলো দুলছে। আহা কী আনন্দ! বুকের কাছে, মাথার কাছে কোমল রেশমি পালকের মতো কাশফুলের নরম ছোঁয়া।

কিন্তু পায়ের নিচে যে আরও কত বিস্ময়! মাটির ওপরটা ঘন কাঁথার মতো হয়ে ঢেকে আছে অনেক ভূ-আচ্ছাদি আগাছা। গদির মতো লাগছে সে তরু-আচ্ছাদন। বুনো ফুলে সেসব গাছ ভরে আছে। সবুজ ঘন পাতার ভেতর যেন রাতের মতো জ¦লছে বেগুনি-সাদা ও সাদা রঙের হাজার হাজার ফুল। সেগুলোর মধ্যে পেলাম পানিঘাস আর সাদা তারার মতো একটা ফুল। সে ফুলের নাম ব্রাজিলীয় পাসলি বা ট্রপিক্যাল মেক্সিকান ক্লোভার। ফুল সাদা, তাই এর অন্য নাম হোয়াইট আই। কোনো বাংলা নাম নেই। ওসব দেশ থেকে এ আগাছা বহুকাল আগেই আমাদের দেশে এসে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এ গাছ সাধারণত খোলা পতিত মাঠে, রাস্তার ধারের ঢালে ও নিচু জমিতে জন্মে। তার মতো ছোট্ট সাদা ফুল, তাই স্থানীয় লোকেরা তাকে তারাফুল বলে ডাকে, সাদা তারাফুলও বলা যেতে পারে। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Richardia brasiliensis, গোত্র রুবিয়েসি বা কফিগোত্রীয়। এ গোত্রের রিচার্ডিয়াগণের বিশ্বে ১৫টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের ডাটাবেজ অনুসারে মাত্র দুটি প্রজাতি এ দেশে আছে একটি হলো রিচার্ডিয়া ব্রাজিলিয়ানা, অন্যটি রিচার্ডিয়া স্ক্যাব্রা। দুটি প্রজাতিরই ফুল ও পাতা দেখতে প্রায় একই রকম। তবে প্রথমোক্ত প্রজাতির গাছ ও পাতা স্বল্প রোমশ, দ্বিতীয় প্রজাতিটির পাতা সে রূপ না, রোমশ ও খসখসে। এজন্য একে বলে রাফ মেক্সিকান ক্লোভার। সাভার, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে এটি পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও ময়মনসিংহেও এ গাছ আছে বলে জানা গেছে।

এটি খুবই ছোট আকারের বীরুৎ ও নরম স্বভাবের গাছ। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এ গাছ এক বা কয়েক বছর বাঁচে। মাটির ওপরে গাছ মরে গেলেও মাটির নিচে যদি শিকড় না মরে তাহলে বৃষ্টি পেলে সেসব শিকড় থেকে আবার গাছ গজিয়ে ওঠে। গাছ ৩০-৪০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হয়। কিন্তু ওই মাঠে গিয়ে ততটা লম্বা মনে হলো না। কেননা এর শাখাগুলো মাটিতে গড়িয়ে চলে। মাঝে মাঝে ফুল ফোটার জন্য শাখার ডগাগুলো মাথা তুলে খাড়া হয়। পাতা ডিম্বাকার, অগ্রভাগ সুচাল, নরম ও কিছুটা পুরু, ধূসর সবুজ। পাতা ৫-৭ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। শাখার শীর্ষে পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটা ফুল থোকায় ফোটে। কখনো কখনো একটি থোকায় ২০টি পর্যন্ত ফুল ফুটতে পারে। ফুল ছোট্ট, পাপড়ির বিস্তার বড়জোর এক সেন্টিমিটার, পাপড়ি পাঁচটি, ধবধবে সাদা। কখনো কখনো কোনো কোনো ফুলের পাপড়িতে হালকা গোলাপি আভা দেখা যায়। এর ফল একটি ক্ষুদ্র শক্ত বাদামের মতো যাকে বলে নাটলেট। এ দেশে আগাছা যা সহজে নির্মূল করা যায় না।

এদের বৃদ্ধি থামাতে পারে মাটির নিচে থাকা কিছু কৃমি। কেননা এদের শিকড়ে সেসব কৃমিরা মাঝে মাঝে থাকতে আসে, বাসা বাঁধে ও শিকড় থেকে তারা খাবার খায়। কৃমিদের বংশবৃদ্ধি হলে শিকড়ের সেসব অংশ ফুলে গিঁটের মতো হয়ে যায় ও সেসব শিকড়ের মাধ্যমে তখন গাছের ওপরে মাটির পানি ও পুষ্টি চলাচল ব্যাহত হয়। ব্রাজিলে এ উদ্ভিদ বমিরোধক ও ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় বলে জানা গেছে। দক্ষিণ আমেরিকাতেও লোক চিকিৎসায় এ গাছ ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে  গ্রামের লোকেরা প্রয়োজনে বমি করানোর জন্য পুরো গাছই ব্যবহার করে। এ ছাড়া চর্মরোগ, ছোটখাটো ক্ষত চিকিৎসায় এ গাছ ব্যবহৃত হয়। হাঁপানি ও সর্দি-কাশির উপশম করে। তবে এ সবই লোক চিকিৎসা, জানা দরকার বিজ্ঞানসম্মত তথ্য ও পদ্ধতি। এসব নিয়ে গবেষণা করলে নিশ্চয়ই আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত