শিক্ষায় এআই নির্ভরতা

নৈতিকতা রক্ষায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ এএম

পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, বিশ্বতাত্ত্বিক, বিজ্ঞান দার্শনিক স্টিভেন উইলিয়াম হকিং ও আমেরিকান কম্পিউটার বিজ্ঞানী মেলানি মিচেল শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই ) ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। হকিংয়ের ভাষ্য, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণ বিকাশ মানবজাতির সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে’। আর মিচেল বলেছেন, ‘আমরা এআইর অগ্রগতিকে অনেক বড় করে দেখি, কিন্তু মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার গভীরতাকে অবমূল্যায়ন করি’। আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতায় তাদের আশঙ্কা কীভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এর সাক্ষ্য মিলেছে ১৪ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষায় বাড়ছে বিপদ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট সারতে, প্রেজেন্টেশন সøাইড, ক্লাস টেস্ট ও গবেষণায় বাড়ছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। রেফারেন্স বই, রিসার্চ পেপার, জার্নাল ও ওয়েবসাইট ঘেঁটে বিশ্লেষণের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন এক ক্লিকের সহজ সমাধান। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে এআই-নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এআইয়ের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে  শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির বিষয়টি এসেছে।

শিক্ষায় এআই নির্ভরতা, এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং মানুষের চিন্তাশক্তি ধরে রাখার গুরুত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে কথা কম হয়নি। শিক্ষার্থীরা যখন বিশেষ করে শিশুরা এআই ব্যবহার করে সরাসরি উত্তর পেয়ে যায় তখন তারা নিজেরা চিন্তার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে তো শেখেই না, পাশাপাশি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পরিশীলিত হওয়ার দরজায় তালা দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় তারা কোনো ভালো যুক্তির কাঠামো বুঝতেও শেখে না, কারণ তারা আসলে মূল পড়ালেখা করছে না। হৃদয়কে সিদ্ধান্ত নিতে না দিয়ে এআইর ওপর যেন সব ভার সঁপে দেওয়া হচ্ছে। এআই চটজলদি তথ্য দিলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই কতটা গভীর ও নিখুঁত তাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। জ্ঞান-প্রজ্ঞার বিকল্প তো নয়ই। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখছি, এআই যখন তৈরি উত্তর দিয়ে দেয়, তখন  চিন্তাশক্তি অলস হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তির বিকাশ ও উৎকর্ষের এ যুগে প্রযুক্তিকে বর্জন করে নয়, বরং কীভাবে এর অপব্যবহার না করে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণের পথ নিষ্কণ্টক করা যায় এদিকে শিক্ষাঙ্গন কর্র্তৃপক্ষ ও পরিবারের দায়িত্বশীল সবার মনোযোগ গভীর করা জরুরি। নৈতিকতার স্খলন ঘটে এমন যে কোনো কিছুর অনুসরণে শিক্ষার আলোয় উৎকর্ষ হওয়া দুরূহ। আমাদের শিক্ষায় এআই সম্ভাবনার বদলে সংকটের ছায়া প্রলম্বিত করছে এরও তথ্য মিলেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এআই একদিকে যেমন সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে সামনে রেখেছে গভীর চ্যালেঞ্জ এবং প্রশ্নও। শিক্ষকের অভাব, মানসম্পন্ন পাঠ্যসামগ্রীর সংকট, বৈষম্য, শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্ষত এসব বিষয়ও যে শিক্ষার্থীদের বক্রপথে ধাবিত করছে, এই বাস্তবতা এড়ানোও সহজ নয়। দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষাকে সমতাপূর্ণ, কার্যকর ও অধিকতর মানবিক করতে না পারলে প্রযুক্তির বিকাশের সুফল মিলবে না। এআইর ওপর অতিনির্ভরতা তরুণ শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক দক্ষতারও অবনতি ঘটাচ্ছে।

শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব-প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ওপরের স্তরের শিক্ষার্থীরা তো বটেই, সিংহভাগ শিশুই এখন প্রশ্ন করে না, গুগলে অনুসন্ধান করে। অনেক শিক্ষকও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন না, এআই অ্যাপে উত্তর লিখে দেন। বহু ক্ষেত্রেই এও দেখা যাচ্ছে, স্মার্টফোন-ট্যাবই যেন হয়ে উঠেছে বর্তমানের নতুন শ্রেণিকক্ষ! কিন্তু সময় যদি প্রশ্নহীন, চিন্তাহীন হয়ে সৃজনশীলতার পথে দেয়াল তুলে দেয় তাহলে পরিণতি কী দাঁড়াবে এ নিয়ে গভীর ভাবনা ও করণীয় নির্ধারণের সময় যে বয়ে যাচ্ছে তা দায়িত্বশীলরা ভুলে না গেলেই মঙ্গল। ‘ডিপ লার্নিং’ বা গভীরভাবে শেখার প্রবণতা যদি ‘তৈরি পেয়ে যাওয়ার’ গ্রাসে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে তাহলে আশার ক্ষেত্রগুলো নৈরাশ্যের ছায়ায় হারিয়ে যাবে, তাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। তিব্বতের অধিকার ও অহিংস আন্দোলনের ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলুগ স্কুলের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক এবং প্রাক্তন রাজনৈতিক নেতা নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী দালাই লামা যথার্থই বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো আমাদের ভেতরের সুপ্ত বিকাশ ঘটানো এবং জীবনে পথ দেখানোর জন্য একটি নৈতিক কম্পাস তৈরি করা’। আমাদের প্রজন্মকে কি আমরা নৈতিক কম্পাস তৈরির উপযুক্ত করতে পারছি?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত