রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যাংকটির ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ সদস্যদের মধ্যে গতকাল সোমবার সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র বলছে, এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের কারণে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনের ফুটপাতের টং দোকান ও খাবারের দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে ব্যাংকটির সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান নেন। এর কিছু সময় পর সেখানে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ সদস্যরা অবস্থান নিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোঁটা ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়া ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি ফেরত পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
এর মধ্যে গতকাল সংঘর্ষের পরও ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যায় গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা। কর্মসূচি থেকে দ্রুত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুরুন্নবী মানিক বলেন, পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ছে। তাই দ্রুত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া গ্রাহকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ফোরামের প্রায় ৩০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আরও ২৫ থেকে ৩০ জন চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।
অন্যদিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মোজাম্মেল নামে একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকাল ৭টা থেকে আমরা দ্বিতীয় দিনের মতো ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে কর্মসূচি পালনের জন্য জড়ো হতে থাকি। পরে গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা আমাদের আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে অতর্কিতে হামলা করে। আমাদের ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রক্তের বিনিময়ে হলেও সরকারের কাছে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানাব। এখন বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আন্দোলন করতে হচ্ছে।’
সংঘর্ষের কারণে ব্যাংক টাওয়ারের সামনের ফুটপাতের হোটেল ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের কয়েকজন জানান, তারা প্রতিদিন ব্যাংক ও আশপাশের অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সংঘর্ষের কারণে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয়েছে। ভাঙচুরে কিছু মালপত্রও নষ্ট হয়েছে। ফুটপাতের এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা কোনো পক্ষের সঙ্গে নেই। প্রতিদিনের মতো দোকান খুলে বসেছিলাম। হঠাৎ দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। ইটপাটকেল এসে দোকানে পড়ে। চেয়ার-টেবিল ও কিছু জিনিসপত্র ভেঙে গেছে। ভয়ে দোকান বন্ধ করে চলে যেতে হয়েছে।’ আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সংঘর্ষের কারণে শুধু মালপত্রের ক্ষতি হয়নি, দিনের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দিন এনে দিন খাই। রাজনৈতিক বা কোনো পক্ষের কর্মসূচির কারণে যেন আমাদের ক্ষতি না হয়, সেটি সংশ্লিষ্টদের দেখা উচিত।’
এদিকে সংঘর্ষের পর ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা দুপুরের পর চলে যান। অন্যদিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিকেল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মহসীন আল মুরাদ জানান, সকালের সংঘর্ষের ঘটনা তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবগত নন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। তাই চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সংঘর্ষে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম, গ্রাহকদের আস্থা এবং মতিঝিলের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।