ভাঙনের পথে যুক্তরাজ্য!

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতার দাবিতে নতুন করে একজোট হয়েছেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। তিন অঞ্চলের ফার্স্ট মিনিস্টার গতকাল সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে এক নজিরবিহীন বৈঠকে বসেন। বৈঠকে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করে একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ ইওরওয়ের্থ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নেইল। কার্ডিফ বে-সংলগ্ন পাঁচতারকা সেন্ট ডেভিডস হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিন নেতার স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিন অঞ্চলেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌথ বিবৃতিতে গণভোট আয়োজনে যুক্তরাজ্য সরকারকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইতিহাসে এই প্রথম যুক্তরাজ্যের তিন স্বশাসিত অঞ্চলের সরকার এমন রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা সরাসরি স্বাধীনতা অথবা আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণকে সমর্থন করে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ঘোষণাপত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের বিষয় ছাড়াও অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে, স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস ইইউতে যোগ দিতে চায় এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনরেকত্রিত হতে চায়। তাছাড়া, ওয়েলস কর ও রাজস্ব আদায়ে আরও বেশি ক্ষমতা দাবি করছে।

তিন অঞ্চলের নেতাদের ঘোষণাপত্র সইয়ের লক্ষ্য হলো, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামের ওপর চাপ বাড়ানো। সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইঙ্গিত দেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে জনগণের মধ্যে ‘স্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হলে নতুন করে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে। তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতাপন্থি নেতাদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পরে সুইনিকে লেখা এক চিঠিতে বার্নহ্যাম স্পষ্ট করেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে আর কোনো গণভোট আয়োজনের প্রশ্নই নেই। বার্নহ্যাম বলেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোটের পক্ষে কোনো ঐকমত্য নেই। একইভাবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়এমন স্পষ্ট ভিত্তিও নেই। বার্নহ্যাম আরও বলেন, লেবার পার্টির ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল যে দলটি স্বাধীনতা কিংবা আরেকটি গণভোটকে সমর্থন করে না।

এর আগে, গত রবিবার স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি বলেন, প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডতিন অঞ্চলেই স্বাধীনতাপন্থি ফার্স্ট মিনিস্টার রয়েছেন। তিনি বলেন, এটি স্পষ্ট করে যে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো আর টেকসই নয় এবং ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্য-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সুইনি আরও বলেন, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে গতি এখন স্পষ্ট। তার দাবি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এখন হয়তো ভাবতে হচ্ছে যে ইতিহাসে তিনি যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হতে পারেন। চলতি বছর মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলসে লেবার পার্টির শোচনীয় পরাজয় হয়। স্কটল্যান্ডে ছয়টি আসন হারালেও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি এখনোও প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ২০২২ সালের ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকেই উত্তর আয়ারল্যান্ডে ক্ষমতায় থাকা সিন ফেইন আগামী বছরের নির্বাচনেও জয়ী হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন লন্ডনের কেন্দ্রীয় সরকার নানামুখী রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। যুক্তরাজ্যে ভাঙনের এই শঙ্কার মধ্যেই বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শনিবার ডাবলিন সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ ছেড়ে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড’ গঠন করলে তিনি তা সানন্দে সমর্থন করবেন এবং বিষয়টি ‘দারুণ’ হবে। তার এই মন্তব্য উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপরে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে গণভোটের একটি সাংবিধানিক পথ রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত