পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিমসটেকভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা এড়িয়ে আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এই জোটকে আরও কার্যকর করতে পারস্পরিক বিশ্বাস, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অভিন্ন উদ্দেশ্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিমসটেককে সফল করতে হলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না, বরং সম্পৃক্ততার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।’
সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হোটেলে বিমসটেক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে জোটের মহাসচিব ইন্দ্র মনি পান্ডে ও তার স্ত্রী সুষমা পান্ডে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিমসটেক সদস্য দেশের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ বিমসটেকের সব সদস্য দেশ এবং বিমসটেক সচিবালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাস্তবায়নে অগ্রগতি সাধনের পাশাপাশি পরবর্তী বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিও নেওয়া হবে। ২০২৭ সালে ঢাকায় পরবর্তী বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের এ শীর্ষ সম্মেলন অগ্রগতি পর্যালোচনা, নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং অভিন্ন আঞ্চলিক কর্মসূচিতে আরও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসী যে বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আরও গতিশীল সেতুবন্ধন এবং আঞ্চলিক শান্তি, অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তিনি এ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে বিমসটেকের সব সদস্য দেশের সরকার ও জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
তিনি বলেন, ‘মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে সরে আসা উচিত নয়। আমাদের দৃঢ়তা থাকতে হবে। কঠিন চ্যালেঞ্জ, কঠিন উত্তেজনা এবং কঠিন সংলাপকে মোকাবিলা করার মতো দূরদর্শিতা থাকতে হবে, যাতে পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সফল করা যায়।’
তিনি বিমসটেকের মহাসচিব এবং তার দলের সদস্যদের অভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার ও অব্যাহত সেবারও প্রশংসা করেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, ১২ বছর আগে ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা আঞ্চলিক এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। গত ১২ বছরে সচিবালয়টি বিমসটেকের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা, বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সহজ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তগুলোকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এই আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানটির আয়োজক হতে পেরে গর্বিত এবং সচিবালয়কে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আধুনিক আঞ্চলিকতাবাদের উত্থানের বহু আগে থেকেই বঙ্গোপসাগর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে আসছে। এই উপসাগর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি, জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ বহন করেছে। বিমসটেক সেই ঐতিহাসিক সংযোগকে সমসাময়িক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
তিনি বলেন, বিমসটেকের সাত সদস্য দেশ—বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড—একসঙ্গে বিপুল জনসংখ্যা, সম্পদ, মেধা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের কাজ হলো এই অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, খণ্ডিত সরবরাহ ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, জনস্বাস্থ্যঝুঁকি, সাইবার হুমকি, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং মানবিক চ্যালেঞ্জ কোনো দেশের সীমান্ত মেনে চলে না। কোনো দেশ এককভাবে এসব চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারে না। তাই শান্তি, সহনশীলতা ও আঞ্চলিক সমৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী বিমসটেক কেবল আকাঙ্ক্ষিত নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সংগঠনটিকে আরও কার্যকর, দৃশ্যমান, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে জনগণকেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আমাদের কর্মকৌশল বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন— বিশেষ করে সুনীল অর্থনীতি ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ জোরদার করা, যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা ও জনগণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানান হুমায়ন কবির।
তিনি বলেন, বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য এলাকা প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রগতি অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুমায়ন কবির সুনীল অর্থনীতির ওপরও গুরুত্বারোপ করে বঙ্গোপসাগরকে এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ অভিন্ন সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন পথ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা টেকসই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
হুমায়ন কবির বলেন, ‘বিমসটেক উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই যোগাযোগব্যবস্থা থাকতে হবে।’ তিনি এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, উদ্ভাবনী অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের আরও শক্তিশালী সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তির ওপরই সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। তাই সন্ত্রাসবাদ দমন, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, মানবপাচার, মাদকদ্রব্য, সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।’
হুমায়ন কবির পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যুব বিনিময়, পেশাজীবী নেটওয়ার্ক, থিংক-ট্যাংকের মধ্যে সহযোগিতা, উদ্ভাবন এবং বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে আরও বেশি যোগাযোগের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির গুরুত্বও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘বিমসটেককে শুধু একটি আন্তঃসরকারি প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি জীবন্ত আঞ্চলিক কমিউনিটিতে পরিণত হতে হবে।’
বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান এবং বিমসটেক সচিবালয়ের আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব শুধু সভা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব সদস্য রাষ্ট্র ও সচিবালয়ের সঙ্গে কাজ করে বিমসটেকের কার্যক্রম বাস্তবায়নে অগ্রগতি সাধন করবে এবং ২০২৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেবে।
হুমায়ন কবির বলেন, ‘বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক কার্যক্রমগুলো আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।’
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমেই ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
অনুকূল পরিবেশে তারেক রহমানের ভারত সফর: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী