অনুবাদ গল্প

আমাদের বিয়েটা আর নাই

আমেরিকান অভিনেত্রী, কৌতুকশিল্পী ও লেখক অ্যানি করজেন (Annie Korzen) সত্তরের দশকে টিভিতে দ্যুতি ছড়িয়ে বর্তমানে টিকটকের তরুণদের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। আশির দোরগোড়ায় পৌঁছেও জীবনের বাস্তবতা নিয়ে তার তীক্ষ্ণ ও রসাত্মক পর্যবেক্ষণ সর্বমহলে সমাদৃত। গত ২০ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসের জনপ্রিয় ‘মডার্ন লাভ’ বিভাগে প্রকাশিত তার আত্মজৈবনিক রচনা ‘আওয়ার ম্যারিজ ইজ নো মোর’-এ ফুটে উঠেছে এক করুণ জীবনসত্য। রজতরেখার পাঠকের জন্য থাকছে বাংলা অনুবাদে

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

মূল : অ্যানি করজেন

আমার বয়স এখন আশির কোঠায়। বেনি আর আমার বিয়ে হয়েছিল প্রায় একান্ন বছর আগে। আমরা আদর্শ জুটি ছিলাম না—উনি ভোরবেলা ওঠা মানুষ, আমি রাতজাগা পাখি। উনি খেলা আর খবর দেখেন, আমি ব্রিটিশ ক্রাইম সিরিজে ডুবে থাকি। উনি ঘরেই থাকতে চান বেশিরভাগ সময়, আমি বাইরে বাইরে থাকতে ভালোবাসি।

কিন্তু উনার মধ্যে একটা ভালো দিকও ছিল—উনি আমার কাজ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। আমাকে যেখানে যেতে হতো, গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতেন। আর বাটিতে যখন চেরিফল থাকত, শেষ কয়েকটা সবসময় আমার জন্য ছেড়ে দিতেন। আমরা একটা দারুণ সন্তান বড় করেছি। ভ্রমণ করেছি। জীবন ভালোই কেটেছে।

তারপর বুড়ো হয়ে গেলাম—আর, মজা শেষ। বেনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন—

প্রোস্টেট, কিডনি, হার্ট, চোখ, থাইরয়েড, গাঁটের বাত, শেষ পর্যন্ত সেপসিস।

আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জরুরি বিভাগে, আইসিইউতে কাটিয়েছি। দিনের পর দিন ফোন ধরে কাটিয়েছি—বীমা কোম্পানি, ব্যাংক, হোম কেয়ার এজেন্সি—সব জায়গায়। আমি ভাবতাম, আমি এত স্বার্থপর আর কোমল হৃদয় যে কখনো কারও সেবিকা হতে পারব না। কিন্তু কোনোক্রমে সামলে নিয়েছি—উনার অস্ত্রোপচারের ক্ষত পরিষ্কার করেছি, ক্যাথেটার বদলেছি, গোসল করাতে সাহায্য করেছি। এসব কঠিন ছিল, কিন্তু তার চেয়েও কঠিন ছিল—বেনির মন ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো ঢেকে যাওয়া।

উনি সকালের নাশতা বানাতে গিয়ে তিন পাউন্ড আলু সিদ্ধ করতে বসতেন, তারপর চুলা বন্ধ করতে ভুলে যেতেন—যতক্ষণ না ধোঁয়ার অ্যালার্ম বাজছে।

টিভির রিমোট কীভাবে চলে, তা মনে থাকত না উনার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু ফাঁকা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অন্ধকার সময়গুলোতে আমি একটা বুদ্ধের উক্তি বারবার পড়তাম—এক বন্ধু আমাকে দিয়েছিল : ‘মন যখন অস্থায়ী জিনিসে স্থায়ীত্ব খোঁজে, তখন দুঃখ শুরু হয়। মেনে নাও—কিছুই এক রকম থাকে না।’

আমাকে মেনে নিতে হলো—যে বিয়েটা আমি লালন করতাম, সেটা আর নেই।

যে স্বামীটাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, সে উধাও।
ইলাস্ট্রেশন- নিউইয়র্ক টাইমস -- ফিউশন- দেশ রূপান্তর
বেনির সেবা করা হয়ে দাঁড়াল আমার পূর্ণসময়কার চাকরি। আমি আমার নিজের জীবন থমকে দিলাম, থামিয়ে দিলাম। চুল কাটা পেছালাম আর পেছালাম, দাঁতের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করলাম এবং এমন কিছু করলাম, যা কোনো ফ্রিল্যান্স অভিনেত্রী-লেখিকা কখনো করে না—কাজ ফিরিয়ে দিতে লাগলাম।

সামাজিকতায় আগ্রহ হারিয়ে গেল। আমার কী নিয়ে কথা বলার থাকবে?

তবু ছোট্ট আনন্দ বের করতাম—সূর্যাস্তের সময় একটু হাঁটা, দুপুরে একটু ঘুম আর কিছু চকলেট-চর্বি খাওয়া।

কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে সামনের বিষণ্ণ দিনটাকে ভয় পেতাম। আর সামনের ফাঁকা জীবনটাকে ভয় পেতাম। বেনি কিন্তু উল্টো ভাবতেন—উনি মনে করতেন এটা অস্থায়ী সমস্যা। সবাইকে বলতেন, ‘আমি দিন দিন ভালো হচ্ছি।’ কখনো কখনো সত্যি অস্বীকার করাটাই আশীর্বাদ।

তারপর একদিন বেনি পড়ে গেলেন। আর হঠাৎই—কোনো যন্ত্রণা, কোনো ভয় ছাড়াই—উনি চলে গেলেন। (আপনি যদি বিদায়ের পথ বেছে নিতে পারেন, তবে হার্ট অ্যাটাক বেছে নেবেন।)
সদ্যপ্রয়াত স্বামী বেনি করজেনের সঙ্গে লেখক অ্যানি করজেন
আমি ৯১১ ডায়াল করলাম, এক প্রতিবেশীকে ফোন দিলাম। তারপর মুহূর্তের মধ্যে আরও ডজনখানেক মানুষ এসে পড়লেন। অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, লাশ সরানো, নানা কাগজপত্র খোঁজা—এত ঘণ্টা আমাকে একা ঘিরে রাখা মানুষগুলো খুব সাহায্য করলেন। একা কীভাবে সামলাতাম, ভাবতেও পারি না।

আমাদের দলে ছিলেন জার্মানি, মেক্সিকো, ভারত, টেক্সাসের মানুষ। তারা ওয়াইন আর নাশতা এনেছিলেন। বেনির প্রিয় গান বাজালাম—লুই আর্মস্ট্রংয়ের ‘হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড’। উনার অদ্ভুত আচরণের গল্পগুলো শুনিয়ে হাসালাম সবাইকে। এই সরল, স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণটাই আমার সহজ-সরল স্বামী চাইতেন।

পরের দিন আমি নিজেকে একটু লম্বা হাঁটার সুযোগ দিলাম। মৃদু গোসল সেরে বেরিয়ে দেখি—আমাদের বাড়ির ওপরের আকাশে সবচেয়ে অসাধারণ রামধনু উঠেছে। কয়েক মিনিট পর বন্ধুরা ফোন করে বলল—একটা বাজপাখি তাদের জানালায় বসে ১৫ মিনিট তাদের দিকে তাকিয়ে উড়ে গেছে। তারা বলল, বাজপাখিটা বেনি—বলেছিল, বেনি তাদের বিদায় জানাতে এসেছিল।

আমি ভূত-আত্মায় বিশ্বাস করি না। যখন কোনো অলীক-কল্পনাপ্রিয় বন্ধু বলে ‘মন খোলা রাখো’, আমি বলি, ‘এত খোলা রেখো না যে মগজ বেরিয়ে পড়ে।’

তবু স্বামীর মৃত্যুর পরের দিন রামধনু আর পাখি দেখে—আমি অদ্ভুত এক সান্ত্বনা পেলাম।

আমাদের ছেলে জোনাথন দুনিয়ার অন্য প্রান্ত থেকে উড়ে এলো। আমরা ঠিক করলাম, ও এখানে থাকা পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যা ৫টা থেকে ৭টা—লোকজন আসবে। এই অপ্রচলিত শিবা-ককটেল পার্টিগুলো আমার জন্য ছিল জীবনে ফিরে আসার সিঁড়ি। মাসের পর মাস পরে থাকা ঘামজামা খুলে ফেললাম। উজ্জ্বল লাল লিপস্টিক আর নেকলেসের মজা আবার ফিরে পেলাম। জোনাথন সব ঘরের কাজ নিজে নিয়ে নিল—আমি ঘরের কাজ ঘৃণা করি, আর বেনির অসুস্থতায় সব কাজের বোঝা আমার ওপর ছিল, তাই এটা আমার কাছে স্বস্তি ছিল।

জোনাথন চলে গেলে আমি একা থাকতে শিখলাম। আমি আর ‘আমরা’ ছিলাম না—আমি ‘আমি’। নতুন একা জীবনের জন্য চারটা নিয়ম বানালাম :

১. ব্যবহারিক কাজে যতটা সম্ভব সাহায্য নাও।
সোশ্যাল সিকিউরিটি আমার বিধবা সুবিধা দিতে চায়নি—কারণ তারা আমার বিয়ের সনদ হারিয়েছিল। একজন সমাজকর্মী আর আমি মিলে অনেক ফোন আর অফিস ঘুরে সেটা ঠিক করেছি।

২. ব্যস্ত থেকো।
প্রতিদিন নিজেকে একটা কাজ দিতাম—একটা তাক, একটা ড্রয়ার, একটা আলমারি। বেনির বিশৃঙ্খলা সাজাতে সাজাতে মন ভালো হয়ে যেত। আর পেয়েছি কিছু মিষ্টি জিনিস—যেমন উনার আঁকা আমাদের দুজনের একটা মজার স্কেচ।

৩. নিজেকে আদর করো।
বছরখানেক পর ম্যাসাজ, ফেসিয়াল, ম্যানি-পেডি করিয়েছি—অসাধারণ লেগেছে। হয়তো শুধু স্পর্শেরই খুব দরকার ছিল।

৪. দিনে অন্তত একবার কোনো জীবন্ত মানুষের সাথে কথা বলো।
আমি সামাজিকতা বাড়াতে লাগলাম।

কখনো কাউকে দেখতে না পেলে সেকেন্ডহ্যান্ড দোকানে ঘুরতে যেতাম—সেখানে কাউকে না কাউকে পেতাম, গল্প জমে যেত। এই চার নিয়ম আমার নতুন একা জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। আশ্চর্য লাগে, কিন্তু মাঝে মাঝে ভালোও লাগে।

বাজারের পেছনের তরুণী মায়ের গাড়ি দুধ-সিরিয়াল-চিপসে ভর্তি। আমার গাড়িতে শুধু দুধের ছোট প্যাকেট, কিছু এগ রোল, আর একটা কলা। আমি হতবাক—আমি ওর সঙ্গে স্থান বিনিময় করতে চাইব না। ওর জীবন পূর্ণ, ঠিকই। কিন্তু ও ফিরছে বিশৃঙ্খল সংসারে, চাহিদাসম্পন্ন পরিবারের কাছে। আমি ফিরছি আমার শান্ত অভয়ারণ্যে, যেখানে শুধু আমি, আর আমার বিশ্রাম। অনেকদিন পর প্রথম—শুধু আমার যত্ন নিতে হবে। আর আমি নিজেকে খুব বেশি দাবিদার মনে করি না।

লোকে যখন কান্নায় ভেজা সমবেদনা জানায়, শুকনো চোখে বলি—আমি ভালো আছি। তারা হতভম্ব হয়। ওরা ভাবে শোকার্ত বিধবা দেখতে পাবে, কিন্তু আমি তেমন নই। আমি নিজেও ভাবি—আমার কী সমস্যা? প্রিয় স্বামী মারা গেলে যে অপ্রতিরোধ্য দুঃখ হওয়ার কথা, তা কেন আমি পাচ্ছি না?

আমার মনে হয়—আমি বেনিকে হারিয়েছিলাম যখন উনি বেঁচে ছিলেন। তখনই আমি শোক করেছি—নীরবে, দীর্ঘদিন। এখন যা পাচ্ছি, তা দুঃখের চেয়ে বেশি—স্বস্তি। বেনির সঙ্গে সংসার করে ভালোবেসেছি। এখন একা থাকতেও ভালোবাসি।

কী করে দুটোই সত্যি? ‘মেনে নাও—কিছুই এক রকম থাকে না।’

তবু মাঝে মাঝে বিষণ্ণতা আসে। ওয়ার্ড পাজল একবারে সমাধান করেছি—বেনি ছিল না হাই-ফাইভ দিতে। দুজনের জন্য টেবিল সাজিয়ে ফেলি মনের ভুলে, উনার পাশের বালিশ ফুলাই। মজার কথা শুনলে উনাকে বলতে ইচ্ছে করে। বিদেশ ভ্রমণের গল্প পড়া বন্ধ করে দিয়েছি—উনার সঙ্গে যে স্বপ্ন দেখতাম, তা মনে পড়ে।

কিন্তু সেই সঙ্গে স্বাধীনতাটাও উপভোগ করি। যে সময় ইচ্ছে খাই, যা দেখতে চাই দেখি। সারা রাত ঘুমাই—ভয়ানক স্বপ্ন দেখে আরও ভয়ানক বাস্তবে জেগে উঠতে হয় না।

চুলের রঙ বদলাব ভাবছি, কুকুর পালব কিনা ভাবছি। আবার ফিরে পেয়েছি ছোটখাটো আনন্দ। আর অবাক হয়ে দেখছি—মাঝে মাঝে এমন কিছু জ্বলজ্বল করে, যা আমি আর কখনো পাব না ভেবেছিলাম। আমার ধারণা, একেই বলে সুখ।

দয়া করে আমাকে অযথা আপনার দাঁড়িপাল্লা দিয়ে বিচার করবেন না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত