জ্বর আসার পর চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের বাসিন্দা চার বছরের শিশু তাসমীনকে প্রথমে নেওয়া হয় স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে। তার পরামর্শে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ চললেও বমি ও রক্তচাপ কমা বন্ধ হচ্ছিল না। পরিস্থিতি জটিল দেখে তাকে নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। কিন্তু সেখানে কোনো শয্যা খালি ছিল না। এরপর ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতাল হয়ে ছোট্ট তাসমীনকে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হলো, ততক্ষণে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। টানা তিন হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপ শেষে অবশেষে ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর কাছে হেরে যায় অবুঝ শিশুটি।
তাসমীনের মতো একই পরিণতি হয়েছে সীতাকুণ্ডের পাঁচ বছরের শিশু সিরাজুল মনিরারও। কয়েক দিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগে মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ার পর তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রথমে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় তাকে। চমেকের আইসিইউতে একদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুর কাছে হার মানে অবুঝ মনিরাও। বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
তাসমীন বা মনিরার মতো একই অবস্থা হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহু ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে। শুরুতেই রোগ নির্ণয় না করা, ঘরে বসে থাকা, প্লাটিলেট না কমলে ঝুঁকি নেই বলে ধরে নেওয়া এবং শেষ মুহূর্তে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই হারিয়ে যাচ্ছে অমূল্য সময়। চিকিৎসকেরা বলছেন, দেরিতে হাসপাতালে আসাই ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ার একটি কারণ। চট্টগ্রাম অঞ্চলে সম্প্রতি ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো রোগীদের তথ্য এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
রোগীদের শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসার প্রবণতার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) চমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নারে মাত্র ৩২টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৬৮ জন রোগী। শয্যা না থাকায় চিকিৎসাধীন অনেক রোগীদের ঠাঁই হয়েছে ওয়ার্ডের ভেতরের চলাচলের পথ ও করিডোরের মেঝেতে। চমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নারের এক মেডিকেল অফিসার নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের এখানে রোগীরা শেষ পর্যায়ে আসে। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। যারা দ্রুত আসেন, তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২২০ জনে এবং নতুন করে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৯৩ জন। আক্রান্তদের মধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৪০৩ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ১ হাজার ৪৩০ জন রোগী রয়েছেন। উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ডে ৪২৭ জন ও কর্ণফুলীতে ২১২ জন আক্রান্ত। চলতি বছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৭ দিনেই মারা গেছেন ১০ জন।
জেলাজুড়ে আক্রান্তদের মধ্যে ১ হাজার ৬০৮ জন পুরুষ, ৮৮৬ জন নারী ও ৭২৬ জন শিশু। আর মোট ১৫ জন মৃতের মধ্যে নারী ৭ জন, পুরুষ ৪ জন ও শিশু ৪ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাটিলেট নিয়ে ভুল ধারণাই ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে জটিলের দিকে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম বড় একটি কারণ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুর রব বলেন, রোগীদের অবহেলা পরিস্থিতি জটিলের দিকে নিয়ে যায়। অনেকে মনে করে প্লাটিলেট না কমলে ডেঙ্গুতে ক্ষতি নেই। এ কারণে তারা হাসপাতালে ভর্তি বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে চায় না। এটা ভুল ধারণা। সাম্প্রতিক ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের অনেকে শকে মারা যাচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের সচেতনতার বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. এ এস এম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে শক সিনড্রোম ও এক্সপান্ডেড সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে রোগীর দ্রুতই প্রেশার কমে যায়। লিভার, কিডনিসহ নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। দ্রুত শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, যারা শুরুর দিকে হাসপাতালে আসছে, তারা চিকিৎসা ও পরামর্শ পাচ্ছে। অনেকে দেরি করে আসছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।