সিসিটিভির ফুটেজের সূত্রে অপ্রতিম হত্যার তদন্তে পুলিশ

‘তদন্ত শেষে স্পষ্ট জানা যাবে এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কী ছিল—এটি কি শুধুই একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ বা চক্রান্ত যুক্ত ছিল।’

 

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম। তবে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে আর ঘরে ফেরেনি। নিখোঁজের প্রায় ২০ ঘণ্টা পর পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার রক্তভেজা নিথর মরদেহ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তানের এই মর্মান্তিক পরিণতি ও নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা, গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

নিহত অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের মোবাইল ফোনটি নিয়ে বের হয় সে। তবে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলেও ছেলে বাসায় না ফেরায় উদ্বেগ বাড়ে পরিবারে।

নিহত স্কুলছাত্র অপ্রতিম। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের সম্ভাব্য সব জায়গায় ও স্বজনদের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো খবর পাননি স্বজনেরা। অবশেষে কোনো সন্ধান না পেয়ে ওই রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।

কিশোর অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার খবর জানাজানি হলে তাকে খুঁজে বের করতে তাত্ক্ষণিকভাবে তৎপর হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। রাতভর খোঁজাখুঁজির অভিজ্ঞতা জানিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু নাঈম বলেন, ‘নিখোঁজের খবর জানার পর থেকেই রাতভর তাকে খোঁজার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দলে দলে ভাগ হয়ে কোটবাড়ি ও আশপাশ এলাকায় সন্ধান চালিয়েছেন।’

খোঁজাখুঁজির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয়। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম জানান, শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেইটের সামনে অপ্রতিমকে দেখা যায়। সে সময় তার সঙ্গে ক্যাপ পরা আরেক তরুণকে দেখা গিয়েছিল। ওই ছেলেটি বয়সে অপ্রতিমের চেয়ে বড় এবং তার হাঁটাচলাও ছিল বেশ সন্দেহজনক।

প্রেস ব্রিফিংয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ফুটেজ দেখে নিশ্চিত করে যে ক্যাপ পরা ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকারই স্থায়ী বাসিন্দা। বিষয়টি জানার পরপরই পুলিশকে অবহিত করা হয়।

পরদিন আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে কাজ করতে গিয়ে অপ্রতিমের মরদেহ প্রথম দেখতে পান স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আব্দুল কাদির জিলানী ও তার ভাতিজা।

জিলানী জানান, ‘আমার ভাতিজা প্রথমে জঙ্গলে একটা বাচ্চাকে পড়ে থাকতে দেখে আমাকে জানায়। কাছে গিয়ে দেখি শিশুটি পড়ে আছে, মাথায় মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ও রক্ত। বিভৎস দৃশ্য দেখে আমরা ভয় পেয়ে কাজ ফেলে চলে আসি এবং স্থানীয়দের জানাই।’

পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে খবর দেওয়া হলে দুপুরের দিকে জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের রক্তমাখা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ইতোমধ্যে একজনকে আটক করা হয়েছে এবং তাকে পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।

ঘটনার তদন্তের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘অপ্রতিমের মা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা, যা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একাধিক তদন্ত টিম মাঠে কাজ করছে। আটক ব্যক্তিকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে স্পষ্ট জানা যাবে এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কী ছিল—এটি কি শুধুই একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ বা চক্রান্ত যুক্ত ছিল।’

এদিকে নিহতের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে গিয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমার জীবনে যে কটি করুণ মৃত্যু দেখেছি, তার মধ্যে এটি অন্যতম। এই জঘন্য ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে আগামী তিন মাসের মধ্যে যেন বিচারকার্য সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে আমি সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেব।’

স্কুলছাত্র অপ্রতিমের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনসহ সারাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উঠছে বিচারের তীব্র দাবি। স্বজন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা প্রতিটি অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত