ফুসফুস ক্যানসারের ভয়াবহতা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ এএম

ডা. এম দেলোয়ার হোসেন

সহকারী অধ্যাপক, হাঁপানি, বক্ষব্যাধি ও শ্বাসযন্ত্রের ওষুধ বিশেষজ্ঞ

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

ফুসফুসের ক্যানসার হলো ফুসফুসের অতিরিক্ত কোষবৃদ্ধি। কোষের অতিরিক্ত বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া ফুসফুসেই শুরু হয়। স্বাভাবিক কোষ থেকে ভিন্ন, খুব দ্রুত এবং অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই কোষগুলো এক সময় টিউমার তৈরি করে এবং চারপাশের সুস্থ ফুসফুসের টিস্যু ধ্বংস করে। যে কারোর ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। তবে ধূমপান এবং ধূমপানের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তির এই আশঙ্কা খুব বেশি থাকে।

ফুসফুসের ক্যানসারকে সাধারণত ২ ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হলো ছোট কোষের ফুসফুসের ক্যানসার SCLC)  এবং নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যানসার (NSCLC)। ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ তামাক গ্রহণ। যারা প্রতিদিন দুই থেকে তিন প্যাকেট সিগারেট সেবন করেন। ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে এই সেবন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে তাদের ৯০ ভাগের ফুসফুসে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লক্ষণ : ফুসফুসের ক্যানসারের অনেক লক্ষণ রয়েছে। যদি টিউমারের আকার ছোট হয় তাহলে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যদি টিউমারের পরিমাপ বড় হয় তখন লক্ষণ দেখা যায়। তখন কাশি থাকে এবং কাশির সঙ্গে রক্ত পড়ে। এ ছাড়া শরীরের ওজন কমে আসে, গলার স্বর ভেঙে যায়।

কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে : টিউমারটি যখন ছোট থাকে তখন সমস্যা ধরা পড়ে না। কোনো টিউমার যদি পাশে থাকে সে ক্ষেত্রেও বোঝা যায় না। এটি আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়। যারা ২০ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ধূমপান করে তারা যদি এক্স-রে করে বা স্ক্রিনিং করে তাহলে অনেক সময় সমস্যা ধরা পড়ে।

ফুসফুস ক্যানসার নির্ণয় :

বুকের এক্স-রে : প্রথম অবস্থায় ফুসফুস ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য বুকের এক্স-রে এর সঙ্গে ফ্লুরস্কোপি, বুকের সম্মুখ এবং পাশর্^ীয় রেডিওগ্রাফ এবং পার্শ্বীয় টমোগ্রাম করা হয়।

সি.টি. স্ক্যান : বুকের সি.টি. স্ক্যানের সঙ্গে সি.টির অধীনে ফুসফুসের পারকিউটেনিয়াস বায়োপসি করা হয়।

বায়োপসি : বায়োপসির মধ্যে রয়েছে মেটাসটাসিস লসিকার বায়োপসি, প্লুরার বায়োপসি বক্ষ নিরীক্ষণ। চামড়ার নিচে থাকা মেটাসটাটিক অর্বুদের বায়োপসি, ব্রঙ্কোস্কোপির পরে বায়োপসি, অপারেশনের সময় ফ্রজেন সেকশনের থেরাপি এবং সি.টি. দ্বারা পরিচালিত পারকিউটেনিয়াস লাঙ্ক পাংকচার এসপিরেশন বায়োপসি।

ব্রঙ্কোস্কোপি : এর মাধ্যমে ব্রঙ্কাইয়াল এন্ডওমেম্ব্রেন এবং লুমেন এ কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে তা বোঝা যায়। এ ছাড়াও ব্রঙ্কোস্কোপির অধীনে টিউমারের বায়োপসি করানো যায় অথবা সাইটোলজিক পরীক্ষার জন্য শ্বাসনালি থেকে রস ও নেওয়া হয়।

স্পিউটাম মাইটোলজি : প্রাথমিক ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে অনেক রোগীর লালা বা থুুতু পরীক্ষা করেও ক্যানসার কোষ শনাক্ত করা যায়। স্পিউটাম সাইটোলজির দ্বারা কেন্দ্রীয় ফুসফুস ক্যানসার সফলভাবে ধরা পড়ার হার ৭০%-৯০% আর প্রান্তস্থ বা পেরিফেরাল ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই হার ৫০%। এর অর্থ হলো যাদের স্পিউটাম সাইটোলজির দ্বারা ক্যানসার ধরা পড়ে না তাদের ক্যানসার আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অন্য পরীক্ষা করাতে হবে।

চিকিৎসা : ফুসফুস ক্যানসারের চিকিৎসার পর্যায়গুলো হলো সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি এবং বিভিন্ন সূক্ষ্ম আক্রমণকারী থেরাপি। যাদের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে অর্থাৎ ক্যানসার কোষ আশপাশে খুব একটা ছড়ায়নি সেক্ষেত্রে সার্জারি করা হয়। প্রয়োজন হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সার্জারির পর রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। পরিণত পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের সার্জারি করার সুযোগ খুব কম থাকে এক্ষেত্রে তাদের জন্য উপযুক্ত হলো বিভিন্ন সূক্ষ্ম আক্রমণকারী থেরাপি যেমন আয়োডিন পার্টিকেল ইমপ্লানটেশন, ইন্টারভেনশনাল থেরাপি এবং ক্রাইওথেরাপি। এ ধরনের রোগীদের জন্য এগুলো হলো বহুল ব্যবহৃত থেরাপি। কারণ এতে কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না এবং রোগী খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসের ক্যানসার যদি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা না পরে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগ পাঁচ বছরের বেশি বাঁচানো সম্ভব হয় না। আর প্রথমে যদি ধরা পড়ে তাহলে পাঁচ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা যায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত