বদলি-পদায়নে বাণিজ্য বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লটারি কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে ১ হাজার ৪৩০ জনকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু স্বচ্ছতার এই প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। লটারি শুরুর আগেই নির্দিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর নাম ঢাকার জন্য নির্ধারিত বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। পরে লটারির মাধ্যমে তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন উপ-বিভাগে পদায়ন দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রক্রিয়ায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী প্রকৌশলী সংগঠন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতাদের পদায়ন করা হয়েছে। এমনকি কয়েক ব্যক্তিকে লটারি প্রক্রিয়ার বাইরেও রাখা হয়েছে। এতে প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন নিয়ে সরকারের স্বচ্ছ কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে; সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গণপূর্ত অধিদপ্তর গত ৩০ জুলাই থেকে লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন শুরু করে। প্রথম দফায় ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং দ্বিতীয় দফায় ৩ আগস্ট ২৫৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) বদলি-পদায়ন করা হয়। সর্বশেষ ৪০৯ জন সহকারী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর লটারি অনুষ্ঠিত হয়। তিন দফায় মোট ১ হাজার ৪৩০ প্রকৌশলীকে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে। লটারি অনুষ্ঠিত হয় সেগুনবাগিচার পূর্ত ভবনে।
অভিযোগ উঠছে, এই প্রক্রিয়া থেকে অনেক প্রকৌশলীকে বাদ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের নাম লটারিতেই আসেনি। তাদের একজন গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৪ এ কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম। নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও তাকে লটারি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আজহারুল দেশ রূপান্তরকে জানান, শুধু তিনি-ই নন, আরও অনেককে লটারির বাইরে রাখা হয়েছে। এর কারণ মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।
এই আজহারুলসহ অন্তত ৭ জন প্রকৌশলীকে লটারি প্রক্রিয়ায় আনা হয়নি বলে জানা গেছে। তাছাড়া অনেককে কৌশল করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বঞ্চিত একদল প্রকৌশলী মন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে তারা অনিয়মের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন। তারা জানান, লটারির মাধ্যমে বদলির প্রক্রিয়ায় কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পোস্টিংয়ের জন্য আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম রাখা হয়। পরে জনসম্মুখে শুধু বক্স থেকে নাম তুলে পোস্টিংয়ের পাশে লেখা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, সারা দেশের কর্মকর্তাদের লটারি হলেও এর সময় কাউকে জানানো হয়নি। অনলাইনে দেখার ব্যবস্থা, নাম ঘোষণার জন্য মাইক ব্যবহার করা কিংবা স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। অনেকটা গোপনে ও তাড়াহুড়া করে প্রক্রিয়াটি শেষ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অন্যান্য বিভাগের উদ্বৃত্ত কর্মকর্তা নির্ধারণের আগেই ঢাকার বক্সে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পছন্দের প্রকৌশলীদের নাম ঢোকানো হয়। অন্যান্য জেলার লটারি না করেই সবার আগে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর নাম তোলা হয়। ফলে উদ্বৃত্ত নির্ধারণের আগেই ঢাকার বক্সে এসব কর্মকর্তার নাম কীভাবে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তাদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে এত বিপুলসংখ্যক পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকায় পদায়নের নজির নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, হাইকোর্ট, বিমানবন্দর, পরিকল্পনা কমিশন, ঢাকা মেডিকেল ও রমনা এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাদের পদায়ন করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন শুরু করা হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এর আগে এসব প্রতিটি বদলি-পদায়ন ছিল অনৈতিক বাণিজ্যের এক একটি উৎস। সেটি বন্ধ করতে এই প্রক্রিয়ায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে কোনো ফাঁক থাকলে সেটা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আগে থেকেই ঢাকার বক্সে নাম : অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ আমলের গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সৌরভ রায় ময়মনসিংহের বাসিন্দা, নিয়ম অনুযায়ী তার লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য হওয়ার কথা। কিন্তু তাকে শেরেবাংলা নগর মেডিকেল উপ-বিভাগ থেকে সাভার সার্কেলে পদায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি ঢাকায়ই থাকলেন।
ইজাজ আহমেদ খান নেত্রকোনার বাসিন্দা। তার লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগেই তাকে ঢাকার বক্সে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-৯ থেকে এবার তাকে ধানমন্ডিতে পদায়ন করা হয়েছে। লটারির আগেই তিনি কোন উপ-বিভাগে পদায়ন হতে পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আশরাফুল আওয়াল রানা জামালপুরের বাসিন্দা। তিনি সাভার থেকে মতিঝিলে পদায়ন পেয়েছেন। তার লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগেই তার নামও ঢাকার বক্সে রাখা হয়।
লটারিতে মিরপুরে বদলি হয়েছেন বগুড়ার বাসিন্দা এএসএম সাখাওয়াত ইসলাম। বিগত সময়ে আইইবির নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের প্যানেলভুক্ত নেতা ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি রাজারবাগ গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১ এ, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপ-বিভাগ ও শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার নাম লটারির আগে ঢাকার বক্সে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
রেজাউল করিম মিঠু ফরিদপুরের বাসিন্দা। তিনিও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের প্যানেলভুক্ত নেতা ছিলেন। মতিঝিল গণপূর্ত উপ-বিভাগ, শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-৩, মহাখালী ও ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৭-এ কর্মরত থাকার পর এবার তাকে সংস্থাটির সম্পদ উপ-বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে।
পটুয়াখালী গণপূর্ত উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অসীম চন্দ্র স্বর্ণকার এবার লটারির মাধ্যমে ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি হয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের সর্বশেষ কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে ঢাকা থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হলেও ম্যাপিং লটারির সুযোগে আবার ঢাকায় ফিরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার বাসিন্দা মো. মেহবুবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৫, রাজারবাগ গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১ ও রমনা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এবারও লটারির মাধ্যমে তাকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। অথচ বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হন নামের দুই প্রকৌশলী ঢাকা বিভাগের হওয়ার পরও তাদের চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম নরসিংদী ও ফরিদপুরে দুই জায়গায় উঠানো হয়। পরে তাকে ফরিদপুরে পদায়ন করা হয়।
আসাদুজ্জামান সাদ টাঙ্গাইলের বাসিন্দা। চাকরিজীবনে তিনি কখনো ঢাকার বাইরে কর্মরত ছিলেন না। উত্তরা উপ-বিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৩ ও ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) ঘুরে এবার লটারির মাধ্যমে তার গন্তব্য হয়েছে তেজগাঁও উপ-বিভাগ।
একইভাবে আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশার, গোলাম রাব্বি ও সাইফুল ইসলাম তিনজনকেই যথাক্রমে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপ-বিভাগ, লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপ-বিভাগ এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপ-বিভাগে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগে তাদের তিনজনকেই বঙ্গবন্ধু পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেও আওয়ামীপন্থি প্রকৌশলীর পদায়ন : লটারির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাজনৈতিক পরিচয়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাওয়া একজন প্রকৌশলী নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণপূর্তের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝাকে ২ আগস্ট ফরিদপুর থেকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপ-বিভাগ-২-এর শাখা-১-এ বদলি করা হয়। এই শাখার প্রত্যক্ষ রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। নিমিতোষের বিরুদ্ধে সাবেক ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদে সক্রিয় থাকার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের পর সরকার তাকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের বিষয় হওয়ায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
লটারি প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমকে একাধিকবার কল দিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার তার দপ্তরে গিয়েও সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে বক্তব্যের জন্য একাধিক দিন মোবাইল ফোন নাম্বারে কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভাগওয়ারি লটারি করা হয়েছে। কিন্তু অনেক বিভাগে পোস্টের তুলনায় লোক কম, আবার অনেক বিভাগে লোকের তুলনায় পোস্ট কম। সেক্ষেত্রে অন্য বিভাগ থেকে নিতে হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ওঠা নানা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য গত ৬ সেপ্টেম্বর কমিটি গঠন করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সেই কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনের কাছে লটারির মাধ্যমে বদলির অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, এ সব বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকলে মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখবে।