দেশের ফুটবলের ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ এএম

দেশের ফুটবল ইতিহাসে ২১ সেপ্টেম্বর একটি কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৮২ সালের এই দিনে আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় এমন এক ঘটনা, যার নজির ফুটবলবিশ্বে খুবই বিরল। মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, খেলোয়াড়দের ক্ষোভ, গ্যালারিতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, স্টেডিয়ামের বাইরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, সবশেষে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় দেশের চার তারকা ফুটবলারকে। তারা হলেন কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, প্রয়াত গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ার।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডান মুখোমুখি হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। এর আগেই লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছিল মোহামেডান। ফলে শিরোপার হিসাব না থাকলেও শেষ ম্যাচটি আবাহনীর জন্য ছিল মর্যাদার লড়াই। হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে কোহিনুরের গোলে এগিয়ে যায় মোহামেডান।

ম্যাচের শেষ দিকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। খেলা শেষে ১০ মিনিট আগে আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের জোরালো শট গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন মোহামেডানের গোলরক্ষক মো. মোহসীন। আবাহনীর খেলোয়াড়দের দাবি ছিল, বল গোললাইন অতিক্রম করেছিল। ম্যাচের রেফারি মুনির হোসেন বিষয়টি নিয়ে সহকারী রেফারি মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আবাহনীর খেলোয়াড়রা রেফারিদের ওপর চড়াও হন। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতেও। শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্টেডিয়ামের বাইরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গুলিস্তান এলাকায় ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ প- হয়ে যায়।

ম্যাচ শেষে আবাহনীর খেলোয়াড়রা যে যার অবস্থানে ফিরে যান। কেউ ছিলেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে, কেউ ক্লাবে, কেউবা নিজ বাসায়। কিন্তু রাতেই শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। জাতীয় দলের ক্যাম্প, আবাহনী ক্লাব ও খেলোয়াড়দের বাসা থেকে কয়েকজনকে আটক করে নেওয়া হয় রমনা থানায়। শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড় পাকির আলী ও প্রেমলালের মতো বিদেশি ফুটবলাররাও আটক হয়েছিলেন। পরে শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের ছাড়িয়ে নেন।

চার আবাহনী তারকা সালাউদ্দিন, চুন্নু, হেলাল ও আনোয়ার তবে রেহাই পাননি। পরদিন সকালে তাদের হাজির করা হয় শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে স্থাপিত আঞ্চলিক সামরিক আদালতে। আদালতের রায়ে চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। পরে জনমানুষের ব্যাপক চাপের মুখে ১৭ দিন কারাভোগের পর ৮ অক্টোবর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সাজার পর চার ফুটবলারকে ঢাকার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সালাউদ্দিন ও  চুন্নুকে পাঠানো হয় যশোর কারাগারে। হেলাল ও আনোয়ারকে নেওয়া হয় রাজশাহী কারাগারে।  হাতকড়া পরা চার ফুটবলারের সেই ছবি পরবর্তী সময়ে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দৃশ্যে পরিণত হয়।

কারাগারে যাওয়ার সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট চুন্নুর কাছে, ‘ফুটবল খেলে কারাভোগ করার এমন নজির আমি বিশ্বে খুব একটা দেখিনি। কিন্তু আমাদের বেলায় সেটা হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তখনো জানতাম না, আমাদের দু’ভাগে ভাগ করে দুই কারাগারে পাঠানো হবে। যখন ঈশ্বরদীর দায়িত্বরত পুলিশরা আমাদের বিচ্ছিন্ন করছিল, তখন একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আমরা কোনোভাবেই চাচ্ছিলাম না বিচ্ছিন্ন হতে। খুব কান্না করছিলাম। আমাদের এই অবস্থা দেখে পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কান্নার রোল পড়ে। তখনই বুঝেছি মানুষ আমাদের কতটা ভালোবাসে।’ যশোর কারাগারে পৌঁছানোর স্মৃতিও তার কাছে আবেগঘন। চুন্নু জানান, তিনি ও সালাউদ্দিন যখন কাঁদছিলেন, তখন কারাগারের সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কর্নেল শওকত আলী। তিনি দু’হাত বাড়িয়ে তাদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। চুন্নুর ভাষায়, ‘তখন মনে হয়েছিল একজন অভিভাবক পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

রাজশাহী কারাগারে একই কক্ষে ছিলেন আবাহনীর দীর্ঘদিনের দুই সতীর্থ হেলাল ও আনোয়ার। আনোয়ারের স্মৃতিতে সেই ম্যাচের ঘটনাও স্পষ্ট। তার গোল বাতিলকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। আনোয়ার বলেন, ‘সেই ম্যাচে মোহামেডান এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে। ৮০ মিনিটে আমার একটি গোল বাতিলকে কেন্দ্র করে আবাহনীর খেলোয়াড়রা চড়াও হয়েছিল রেফারিদের ওপর। সেই উত্তেজনা প্রথমে গ্যালারি, এরপর ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকায়। মেজাজ হারিয়ে আমি প্রথম সহকারী রেফারির ওপর চড়াও হই। এরপর হেলালও তাকে পেটায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তখন চলছিল সামরিক শাসন। মাঠের সেই গ-গোলকে তারা পুঁজি করে আমাদের চারজনকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়। ক্রীড়াঙ্গনে পড়ে কালির ছোপ।’

চার ফুটবলারের কারাবাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিবাদ। মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও চার ফুটবলারের মুক্তির দাবিতে পাশে দাঁড়ান মোহামেডানের খেলোয়াড়রাও। প্রয়াত বাদল রায়, আব্দুল গাফফার, ব্যাডমিন্টন তারকা কামরুন্নাহার ডানাসহ ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই আন্দোলনে যুক্ত হন।

মোহামেডানের হয়ে সেই ম্যাচে খেলা আব্দুল গাফফার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘চার ফুটবলারকে আটক ও সাজা দেওয়ার বিষয়টি আমরা মেনে নিতে পারিনি। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন জোরদার করি।’ স্মৃতি হাতড়ে গাফফার বলেন, ‘চার ফুটবলারকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর ফুসে ওঠে ক্রীড়াঙ্গন। প্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের হলেও আমরা প্রতিবাদে মিছিল করি। ঠিক ওই মুহূর্তে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ হজ করতে সৌদি আরবে চলে যান। কিন্তু জেলবন্দি চার ফুটবলারকে মাঠে ফেরানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না কারও। যদিও তৎকালীন ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার)।’ তিনি বলতে থাকেন, ‘আবাহনীর নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন শাহ আলম চৌধুরী ও কামালুর রহমান। দুজনেই জিয়াউর রহমানের বন্ধু ছিলেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদ হজ থেকে দেশে ফিরে এলে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া তাকে টেলিফোন করেছিলেন চার ফুটবলারকে ছেড়ে দিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন।’ যশোর ও রাজশাহী কারাগার থেকে চার ফুটবলারকে ছাড়িয়ে আনার বিষয়ে গাফফার বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধু খোকা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে রাজশাহীতে যাই। মোহামেডানে বাদল ও আমিসহ রাজশাহীতে জাফর ইমামসহ ননী, কুদ্দুস ও তপনের মতো অনেক ফুটবলার সেখানে উপস্থিত ছিল। জাফর ইমামের ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি জেলগেটে বসেছিলেন। তখন আমি চিঠিটা নিয়ে উনাকে হাতে দিই। তখন জাফর ইমাম কারা কর্র্তৃপক্ষকে দেন। কিছুক্ষণ পর রাজশাহী জেল থেকে বের হয়ে আসে হেলাল ও আনোয়ার। বেরিয়েই আমার ডান কাঁধে হেলাল ও বাঁ দিকের কাঁধে আনোয়ার জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। কারণ আমরা খেলার মাঠে যতই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম না কেন, মাঠের বাইরে বন্ধু। একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিল।আমরা যে সময় খেলেছি, আমরা সেটাকে বলি ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর। ইতিহাসে কখনো হয়নি।’ গাফফারের কাছে সেই ঘটনার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক ছিল, আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে পরবর্তী সময়ে এশিয়াডের দলে তাকে বিবেচনা না করা। তবে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে মানুষের প্রতিক্রিয়া। তার ভাষায়, সেই কালো দিন দেশের ফুটবল ইতিহাসে চির অমøান হয়ে থাকবে এবং এর মধ্য দিয়েই ফুটবলের প্রতি মানুষের অনুরাগ স্পষ্ট হয়েছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত