জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন বহাল রেখে সংশোধিত খসড়া বাতিল’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের বয়স ৭ মাস, সাইবার সুরক্ষা আইনের বয়স ৪/৫ মাস। এই ৪/৫ মাসে এমন কী ঘটেছে যে ৪/৫ মাসের মধ্যে এই আইন সংশোধন করতে হবে? সরকারের মধ্যে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ নামে পাস হয়েছে। কিন্তু সাইবার সুরক্ষা আইন পাস হওয়ার ৪/৫ মাসের মধ্যে সরকার হীন উদ্দেশ্যে এই আইন সংশোধন করতে চাচ্ছে।
‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ : নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে গোলাম পরওয়ার বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করেছে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করেছে, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইনে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের হয়রানি হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দল-মত দমন করতে এবং সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ প্রকাশ যাতে না হয় সেজন্য মিডিয়াকে দমন করতে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের পথে হাঁটছে। সরকারকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে তিনি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যথাক্রমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিএনপি সরকারের কার্যক্রমে বোঝা যায় একটি নির্বাচিত সরকার কীভাবে ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠতে পারে। তারা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ গুম করে দিয়েছে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, এমনকি গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সবকিছু বাতিল করতে করতে একদিন জনগণ সরকারকে বাতিল করে দেবে। বাতিল হওয়ার আগে জনরায় মেনে নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ সংসদে পাস হয়েছিল। কিন্তু ওই অধ্যাদেশ পাস হওয়ার পর সরকার দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে আইনটি সংশোধনের জন্য একটি খসড়া আইন তৈরি করেছে। সংশোধিত খসড়া আইনটি বাকস্বাধীনতা দমনের এক ভয়ংকর আইন! সংশোধিত এই আইনটি হবে জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা। এবং এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি।
এ সময় তিনি আরও বলেন, প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠন হলেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য কোনো ওয়েজ বোর্ড গঠন হয়নি। অন্যদিকে শুধুমাত্র বাসসের জন্য নবম ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বৈষম্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সরকারের সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ হচ্ছে আমাদের হাত-পা বেঁধে নদীতে সাঁতার কাটার জন্য ছেড়ে দেওয়ার মতো। তিনি আরও বলেন, এই আইন হচ্ছে সরকার যা খুশি তা করবে কিন্তু জনগণ কিছুই বলতে পারবে না। বললেই মানহানি মামলায় অভিযুক্ত হতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানি মামলায় আওয়ামী লীগের শাস্তির বিধান করেছিল ৩ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড; কিন্তু বিএনপি সেই আইনকে সাইবার সুরক্ষা আইন নাম দিয়ে সংশোধন করে শাস্তির বিধান করতে যাচ্ছে ৫ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড! তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চেয়েও বিএনপির সাইবার সুরক্ষা আইন বেশি ভয়ংকর।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেন, আমাদের আইন হচ্ছে একচোখা। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে মামলা হয়, আটক হয়। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা বা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যাচার করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সাইবার সুরক্ষা আইন সরকার আরও কঠোরভাবে তৈরি করতে চাচ্ছে কেবলমাত্র গণমাধ্যম ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম বলেন, গণমাধ্যম ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬। তিনি আরও বলেন, সরকারের দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিকে প্রটেক্ট করার জন্য এই আইন সরকার সংশোধন করতে যাচ্ছে। এই কালো আইন বাংলাদেশে করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি সরকারকে সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, সরকার সংবিধানের বাইরে যেতে চায় না কিন্তু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইনের নামে জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে। এই আইনে সরকার শুধু জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণই করবে না, বরং দমনও করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের ফটোকপি বিএনপির মধ্যে দেখা যায়। তারা আওয়ামী লীগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে আরও কঠোরভাবে সংশোধনের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইন করতে চাচ্ছে। এই কালো আইনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেও ভূমিকা রাখতে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক রফিকুজ্জামান রুমান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া টিম সদস্য মো. জাহিদুর রহমানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন গ্রীনওয়াচের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক জনতার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, এনটিভির হেড অব নিউজ ফখরুল আলম কাঞ্চন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ব্যারিস্টার আল মামুন রাসেল, ডাকসু জিএস এস.এম ফরহাদ প্রমুখ।
বক্তারা সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন না করতে সতর্ক করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংসদে যেভাবে পাস হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ হিসেবে চলতি বছরের ২১ মে যে গেজেট প্রকাশ হয়েছে, সেই আইন বহাল রাখতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সাংবাদিক আবুল আসাদ বলেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বলে সরকার জুলাই সনদ অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। তার মানে সরকার জুলাই সনদ মানে না। জুলাই সনদ মানে বলেই সরকার পুরোনো কালাকানুন সংশোধন করে আরও জঘন্যভাবে আইন করতে চাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের নামে কালাকানুন তৈরির পথ থেকে সরে আসতে হবে।