ব্রিটিশ রাজনীতির জবাবদিহিতা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ এএম

রাজনীতিতে অর্থের ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ খরচ হয়, রাজনৈতিক দল অর্থ সংগ্রহ করে, প্রার্থীরা জনগণকে কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন, ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্ভাব্য সুবিধাকে সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হলে বিষয়টি অন্য মাত্রা পায়। সেই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা শুধু একটি ‘নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি’ নয়, এটি গণতান্ত্রিক নৈতিকতার একটি গভীর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, নভেম্বরে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে তিনি ৫ হাজার ডলার করে দেবেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’। তার ভাষায়, রিপাবলিকানরা জিতলে ‘আপনিও জিতবেন’ এবং এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ করতে হবে।

শুনতে এটি যেন কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো কোম্পানি নয় আর নাগরিক ভোটার কোনো শেয়ারহোল্ডারও নন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই অর্থ আসবে কোথা থেকে? ট্রাম্প বিস্তারিত কোনো অর্থায়ন পরিকল্পনা দেননি। আনুমানিক ২৪০-২৭০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দিলে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১.২ থেকে ১.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানেই অর্থনৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি নৈতিক প্রশ্নটি প্রবল হয়ে ওঠে। কারণ ঘোষণা করার কাঠামোটি অত্যন্ত রাজনৈতিক : ‘রিপাবলিকানরা জিতলে আপনি ৫ হাজার ডলার পাবেন।’ অর্থাৎ নাগরিকের সম্ভাব্য আর্থিক লাভকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সমালোচকরা এটিকে ‘ঘুষ’ বা ভোট কেনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই সমালোচনা ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। মার্কিন আইনে সরাসরি ‘টাকা দিলে অমুক প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে’ এ ধরনের ভোটের বিনিময়ে অর্থ প্রদান স্পষ্টতই নিষিদ্ধ।

ট্রাম্পের ঘোষণার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা এখানেই : তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে বলেননি, ‘তুমি আমাকে বা রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিলে ৫ হাজার ডলার পাবে।’ বরং বলেছেন, রিপাবলিকানরা জিতলে সবাই পাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ভোটের বিনিময়ে ব্যক্তিগত অর্থ নয়, নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলের সঙ্গে সুবিধাটি যুক্ত। আইন আর রাজনৈতিক নৈতিকতা এক বিষয় নয়। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ রাজনীতিক মোহাম্মদ সরওয়ারের ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করা যায়। ১৯৯৭ সালে গ্লাসগো  গোভান আসনের লেবার এমপি মোহাম্মদ সরওয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ৫০০০ পাউন্ড দিয়েছিলেন এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন। অভিযোগ ওঠার পর লেবার নেতৃত্ব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাকে দলীয় হুইপ থেকে সাময়িকভাবে সরানো হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, সরওয়ারকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করেননি। ১৯৯৯ সালে জুরি তাকে খালাস দেয়। তাই ব্রিটিশ উদাহরণটি ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, ব্রিটেনে এমন অভিযোগ উঠলেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তীব্র হতে পারে, কিন্তু সরওয়ারের ক্ষেত্রে আদালত শেষ পর্যন্ত তাকে অপরাধী বলেননি। এই পার্থক্যটি ট্রাম্পের ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে  রাজনৈতিক অনৈতিকতার অভিযোগ নিজেই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক বেশি সংঘাতময়, দলীয়ভাবে বিভক্ত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফলে একই বক্তব্য একজন রিপাবলিকান ভোটারের কাছে ‘সাধারণ মানুষের হাতে টাকা ফিরিয়ে দেওয়া’ আর একজন ডেমোক্র্যাটের কাছে ‘ভোট কেনার চেষ্টা’ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে।

ট্রাম্পের অসাধারণ ক্ষমতা হলো, তিনি বিতর্ককে প্রায়ই নীতির প্রশ্ন থেকে ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রশ্নে পরিণত করতে পারেন। তিনি শুধু বলেন না, ‘রিপাবলিকানদের নীতি ভালো।’ তিনি বলেন, কার্যত, ‘রিপাবলিকানরা জিতলে আপনিও জিতবেন।’ তার ভাষণে দল, সরকার এবং ‘ট্রাম্প’ এই তিনটি প্রায় একই রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়। এবারের সম্মেলনেও তিনি ভোটারদের এমনকি তাকে যেন ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করতে বলেছেন। এটি নিছক পপুলিসম  নয়; এটি পার্সোনালাইজড  পপুলিসম, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনতুষ্টিবাদ।

 ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের রহস্য। যে মানুষটি মূল্যস্ফীতি, চাকরি, স্বাস্থ্যব্যয় কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হতাশ, তিনি হয়তো নৈতিক দর্শনের চেয়ে ৫ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন। অন্যদিকে একজন মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত ভোটার ভাবতে পারেন, ‘আমার টাকা আমাকে ফেরত দিলে আপত্তি কী’? আবার আরেকজন প্রশ্ন করবেন, ‘কিন্তু সরকার কি আমার ভোটের দাম নির্ধারণ করতে পারে’? গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা হলো, ভোট কোনো পণ্য নয়। রাষ্ট্র নাগরিককে কর, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে; কিন্তু সেই সুবিধার বৈধতা নির্ভর করে একটি সাধারণ নীতির ওপর। এটি জননীতির ফল, কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী ফলাফলের পুরস্কার নয়। সুতরাং ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের ‘ডিভিডেন্ড’কে সরাসরি আইনগত অর্থে ঘুষ বলা হয়তো এখনই অতিরঞ্জিত হবে।

ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়তো এমন ঘোষণায় তীব্র নৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আমেরিকান রাজনীতি সম্ভবত আরও বিভক্ত হবে। কিন্তু দুই দেশের জন্যই মৌলিক প্রশ্ন একই : রাষ্ট্র কি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে নাগরিককে ‘ডিভিডেন্ড’ দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের এই কৌশল ইতিহাসে একজন অসাধারণ পপুলিস্টের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা হিসেবে লেখা হবে, নাকি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় অর্থকে নির্বাচনী অস্ত্রে পরিণত করার এক বিপজ্জনক মোড় হিসেবে।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত