এ বছরের ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ বিএস (ফরেস্ট্রি)-এর ব্যবহারিক ক্লাসের অংশ হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের পাখি-প্রাণী চেনাতে ক্যাম্পাসময় ঘুরে বেড়াচ্ছি। গাছপালাসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ক্যাম্পাসে প্রচুর পাখি-প্রাণী। প্রথম দিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত পাখি-প্রাণী খুঁজে বন ও পরিবেশ অনুষদের আমলকী বাগানের পাশের রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম। এমন সময় রাস্তার পাশের লম্বা লম্বা ঘাসগুলো নড়তে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। অতি সন্তর্পণে সামনে এগোতেই ঘাস নড়ার কারণ বোঝা গেল। ঘর চড়ুইয়ের থেকেও ছোট পাঁচটি পাখি ব্যস্তভাবে ঘাসবীচি খাচ্ছে। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে দ্রুত শাটারে ক্লিক করলাম। ছবি তুলতে তুলতে সামনে এগোতেই ওরা পাশের নারকেল গাছের পাতায় গিয়ে বসল। এবার বেশকিছু ভালো ছবি তোলা গেল।
পরদিন বিকেলে ফের যখন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বের হয়েছি, তখনো আমলকী বাগানের বেড়ার কাছের ঘাস থেকে একই প্রজাতির পাঁচ থেকে ছয়টি পাখিকে ঘাসবীচি খেতে দেখলাম। তবে এদের পালকের রঙ কিছুটা হালকা ও বুক-পেটে তিল নেই। বোঝাই গেল ছানা। বেশকিছু ছবি তোলার পর পাখিগুলো উড়ে গতকালের জায়গায় চলে গেল। আমরাও খানিকটা এগিয়ে ওখানে যেতেই ছানাগুলো ছাড়াও তিনটি চারটি বয়স্ক পাখির দেখা মিলল। সবাই ঘাসবীচি খাওয়ায় ব্যস্ত। ষোলো বছরেরও বেশি সময় ধরে পাখিগুলোকে দেখছি এই ক্যাম্পাসে। একযুগ আগে একদিন বিকেলে আমলকী বাগানের খানিকটা সামনের মাঠে ও বিভিন্ন গাছে শতাধিক একই প্রজাতির পাখি দেখেছিলাম। এখনো ক্যাম্পাসে ওরা আছে বেশ।
এতক্ষণ যে পাখিগুলোর কথা বললাম ওরা আমাদের অতি পরিচিত ও সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি তিলা মুনিয়া। ইংরেজি নাম Scally-breasted/Spotted Munia। ইস্ট্রিলডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Lonchura punctulata। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রজাতিটির দেখা মিলে।
প্রাপ্তবয়স্ক তিলা মুনিয়ার দৈর্ঘ্য ১১-১২ সেন্টিমিটার। ওজন ১২-১৬ গ্রাম। ঠোঁট খাটো ও শক্ত যা শস্য ও দানা খাওয়া পাখিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মাথা গাঢ় বাদামি। লেজসহ দেহের উপরটা বাদামি বা জলপাই-বাদামি। গলাও একই রঙের। চিবুক গাঢ়। বুকের উপরটা খয়েরি। অসংখ্য সাদা আঁশের মতো দাগসহ পেট কালচে-বাদামি। চোখের মণি গাঢ় বাদামি থেকে বাদামি-লাল। পা, পায়ের পাতা, নখ ও ঠোঁট কালো। স্ত্রী-পুরুষে তেমন পার্থক্য না থাকলেও পুরুষের বুকের দাগ ও গলার রঙ স্ত্রীর থেকেও গাঢ়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের উপরটা হালকা বাদামি ও নিচটা লালচে-হলুদ। বুকে কোনো ফোঁটা নেই।
এদেশের শহর-বন্দর-গ্রামে প্রচুর সংখ্যায় এদের দেখা যায়। অত্যন্ত চঞ্চল পাখিটি ফসলের ক্ষেত, মাঠ, নল-খাগড়ার বন, বাগান প্রভৃতি স্থানে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ে বেড়ায়। প্রধান খাবার ঘাসেরবীচি, ধান ও শস্যদানা। বীজ মুখে রেখেই তার থেকে শক্ত খোসা ছাড়িয়ে নিতে পারে চমৎকারভাবে। কীটপতঙ্গও খায়। এমনিতে নিরীহ হলেও ঝাঁক বেঁধে ফসলের ক্ষতিও করতে পারে।
মে থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। খেজুর গাছের মথির ঘন পাতার আড়ালে, লতা-ঝোঁপে, বাবলা, ঝাউ, কেয়া, কান্তা, দেবদারু প্রভৃতি গাছে গোলাকৃতির বাসা বোনে। ঘাস-লতা-ধান পাতা দিয়ে সুন্দর, নরম ও তুলট বাসাটির ভিত্তি রচনা করে। কাশফুল দিয়ে চারপাশটা মুড়ে নেয়। বাসার ভেতরে থাকে কাশফুলের গদি। বাসায় ঢোকার জন্য গোপন সরু পথ বানায় যেন শত্রুরা না দেখে। স্ত্রী-পুরুষ একসঙ্গে বাসা বানায়। আমাদের ক্যাম্পাসে বহুবার ওদেরকে দালানের কার্নিশের নিচে ও টোনারের খালি কার্টনে বাসা বানাতে দেখেছি। একমাত্র গ্র্যাজুয়েট অনুষদ ও আশপাশে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০-২৫টি বাসা দেখা যায়। স্ত্রী মুনিয়া চার থেকে ছয়টি ধবধবে সাদা ডিম পাড়ে। তবে সর্বোচ্চ ১০টি ডিম পাড়ার রেকর্ডও রয়েছে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ১৩-১৫ দিন তা দিয়ে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। আয়ুষ্কাল ছয় থেকে আট বছর। শহুরে মানুষের কাছে পোষা পাখি হিসেবে মুনিয়া বেশ জনপ্রিয়। খাঁচাবন্দি মুনিয়া রাস্তা-ঘাট ও পেটশপে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিক্রেতারা এদের গায়ে নীল, হলুদ, সবুজ বা উজ্জ্বল রঙ লাগিয়ে দেয় যা গোসল করালেই উঠে যায়। পাখি পোষা মানুষের পুরনো সখ। আর এ সখের জন্য বলি হয় লাখো প্রাকৃতিক পাখি।
মুনিয়াদের আবদ্ধাবস্থায় পালন ও বংশবৃদ্ধি করা যায়। কিন্তু প্রকৃতিতেই যে পাখি সহজলভ্য, কষ্ট করে প্রজনন বা ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে তাদের বংশবৃদ্ধি করে বিক্রি করবে তা কি বিশ^াসযোগ্য? গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে এদের জাল দিয়ে ধরে টঙ্গী, ঢাকার কাঁটাবন, মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়। কাজেই যারা পাখি পোষেণ তাদের কাছে অনুরোধ আবদ্ধাবস্থায় ব্রিডিং করা বিদেশি পাখি পুষুন। দয়া করে কেউ এদেশের প্রকৃতির পাখিদের খাঁচাবন্দি করবেন না। তাহলে হয়তো একদিন সহজলভ্য তিলা মুনিয়াগুলোও প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ