ঢাকা স্টক লি. একটি লিমিটেড কোম্পানি ছিল, কিন্তু ন্যূনতম করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন এর ভেতর ছিল। এটি ছিল সদস্য প্রতিষ্ঠান। কথিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মনে করা হতো সদস্যদের ব্যক্তিগত কর্মচারী। আবার সব সদস্য সমান ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না বা সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন না। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কম্যুনিজমবিরোধী সাহিত্যিক জর্জ ওরওয়েলের কথা মনে পড়ে। তিনি কম্যুনিজমের ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন অল অ্যানিম্যাল্স আর ইকুয়াল, বাট সাম অ্যানিম্যাল্স আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে অন্যের চেয়ে বেশি সমান সদস্যরা স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনার ব্যাপারে বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। এদিকে দুই দশকের কম সময়ের ভেতর দুটো বড় শেয়ার কেলেংকারি ঘটল। ইতিমধ্যে শেয়ার মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন করা হলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকার পেরে উঠছিল না। এসইসি অ্যাক্ট-এ বলা হয়েছে যে, শেয়ার ব্যবসা করতে হলে এসইসির সঙ্গে নিবন্ধন করতে হবে। সেই নিবন্ধন করার জন্য এসইসিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের মেনে নিতে হলো। ব্যবসা পরিচালনা বা আনুষ্ঠানিক বিষয়াদির ব্যাপারে এসইসিকে এতটুকু পরোয়ানা করা হতো না বরঞ্চ এক পর্যায়ে অবস্থা এমন হলো যে এসইসি স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। অবশেষে সরকার ২০১৩ সালে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে ডি-মিউচুয়ালাইজড করল। এর ফলে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি তা হলো ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা পৃথক হলো। সবারই প্রত্যাশা যে শেয়ার মার্কেট সক্রিয় হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। আর শেয়ার মার্কেটের মূল যে উদ্দেশ্য, যা শত শত বছর ধরে চলে আসছে, অর্থাৎ দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকা-ে পুঁজি সরবরাহ হবে।
কিন্তু বিধিবাম শেয়ার মার্কেটে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো যে, পরিচালনা পর্ষদ শেয়ার মার্কেটে মূল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে তারা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে লাগলেন। একই সঙ্গে মাঝে মাঝে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে লাগলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থবিরোধী, যেমন আইপিওতে আবেদন করতে হলে বিও অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনের অধিক টাকা থাকতে হবে ইত্যাদি। এখন অবশ্য এই কালাকানুনটা উঠিয়ে নেওওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু বিনিয়োগকারী বিমুখ হয়েছেন। শেয়ার বাজার পরিচালনার সাময়িক কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন সার্কিট ব্রেকার, ফ্লোর প্রাইস নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। অথচ ফ্লোর প্রাইস নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দীর্ঘদিন অব্যাহত ছিল, ব্যাপারটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হয়েছে। তারপর আর একটি ফ্যাশন হলো কোনো কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার আগে রোড শোর আয়োজন। তাও আবার দেশের বাইরে। একবার তো এসইসি, ব্রোকার, উদ্যোক্তা ও স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা পর্ষদ সবাই মিলে আন্তঃমহাদেশীয় রোড শো করে এলেন। কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল তা বলার প্রয়োজন পড়ে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফলাফল হলো বিশাল শূন্য।
সব কিছু ঠিকঠাক মতো চলছে এ রকম অবস্থা দেখানোর জন্য মাঝে মাঝে শেয়ার মার্কেটের সূচকের উত্থান-পতন দেখানো হতো। প্রকৃতপক্ষে শেয়ারবাজার সক্রিয় এর প্রমাণ দেওয়া। শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শেয়ার মার্কেটের সূচি কমানো বাড়ানো খুব সহজ। এই কাজটি করা হয় বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য। সিন্ডিকেটের জন্য আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীদের দায়ী করি। যেমন দৈনন্দিন দ্রব্যাদির সংকট হলেই আমরা কোনো কিছু না ভেবে সরাসরি বলি, এসব সিন্ডিকেটের কাজ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তোবা তা অসত্য নয়। কিন্তু সিন্ডিকেট তো শুধু এদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিন্ডিকেট রয়েছে পেশাজীবী, মেধাজীবী, বুদ্ধিজীবী সর্বত্রই।
পুঁজিবাজারকে প্রকৃতপক্ষে অর্থবহ এবং দেশ তথা রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজে লাগাতে হলে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের শেয়ার বাজারমুখী করতে হবে। বিও অ্যাকাউন্টসের সংখ্যা থেকে বোঝা যায় যে দেশের জনসংখ্যার শতকরা একভাগও শেয়ার বাজারে আসছেন না। আর তালিকাভুক্তির কথা বলার কোনো কারণ নেই। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান বলেছেন, পাবলিক ছাড়া বাজারে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করাকে বলা যায় ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া হ্যামলেট নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করা। হতে পারে দু-এক সময় প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা। বাংলাদেশে সে অবস্থা নেই। বরঞ্চ অতীতে প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তির ফলে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মন বিষিয়ে রয়েছে।
আইপিও অর্থাৎ প্রাথমিক গণ-আহ্বান হলো শেয়ার বাজারের প্রাণ। শেয়ার বাজারের নতুন কর্র্তৃপক্ষের কাছে আইপিও কোনো বিষয়ই নয়। তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তকে। এ প্রসরঙ্গ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন। আইপিও মানে পাবলিকের সংশ্লিষ্টতা। সেই পাবলিককে বাদ দিয়ে কোটা বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা মানে জনগণকে উপেক্ষা করা। খুব সম্ভবত সামিট গ্রুপের একটি কোম্পানি প্রথম প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্ত হয়। যে উল্লাসে সেদিন বিনিয়োগকারীরা যে মূল্যে শেয়ার ক্রয় করেছিলেন, মুনাফা অর্জন তো দূরের কথা, ক্রয়মূল্যেও তাদের সেই শেয়ার বিক্রি করার সৌভাগ্য হয়নি। আরও কয়েকটি কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তির ব্যবহারে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত, আর সে জন্য শেয়ার বাজার থেকে পলায়ন। গত দুবছর তেমন কোনো আইপিও নেই। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কর্র্তৃপক্ষ প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন। তারা বলছেন, আইপিওতে অনেক সময় লাগে। সেক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ তালিকাভুক্তিতে ২-৩ মাস সময় লাগবে। এ ভিত্তিহীন কথা। সার্বিকভাবে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে তাতে আইপিওতে যেতে যে সব তথ্য প্রস্তুত করতে হবে তা ৬০ দিনের ভেতর তৈরি করা সম্ভব। এটা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের আন্তরিকতার ওপর। মনে রাখতে হবে, সংকট শুধু আস্থার নয়, সংকটের অন্য ক্ষেত্রগুলোও উল্লেখ করা হলো।
ধরা যাক বাংলাদেশের ওষুধ সেক্টরের কথা। বাংলাদেশের ওষুধের বাজার অত্যন্ত চাঙ্গা। এখন এই সেক্টরের একটি কোম্পানির শেয়ারের আইপিওর জন্য যদি আন্তর্জাতিক রোড শোর আয়োজনের কথা বলা হয়, তাহলে নিশ্চুপ থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। বাংলাদেশের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বেশ আগে থেকেই উদারনীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে নতুন করে ভাবার কিছু নেই। এ প্রসঙ্গে গ্যালিভারস ট্রাভেলের কথা মনে পড়ে। গ্যালিভার একজন বিজ্ঞানীকে দেখলেন গভীর ধ্যানে মগ্ন। তিনি চিন্তা করছেন কীভাবে শশা থেকে সূর্যালোক তৈরি করা যায়।
ড. ইউনূস সাহেবের শাসনামলে বোধহয় ডজন খানেক কমিশন গঠন করা হয়েছিল। অনেক সুধী সমাবেশ হয়েছিল। আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকেও অনেকে এসেছিলেন। তারা বহু সমাবর্তনের আয়োজন করেছিলেন। পরিশেষে জনগণ কতটা উপকৃত হয়েছেন, তা সময় বলে দেবে। এখানে আর একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে হয় বিএসইসি কর্র্তৃপক্ষ আর একটি কথা বেশ কায়দাকানুন করে বলেছেন। আমরা সাধারণ মানুষ খুব সহজে বুঝতে পারলাম না। তবে যতদূর বোঝা গেল তাতে মনে হয় শেয়ার বাইব্যাকের কথা। একটি কোম্পানি তার তথা শেয়ার হোল্ডারদের মঙ্গলের জন্য নিজের কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাক করার ব্যবস্থা বহুদিন থেকে বহুদেশে চালু রয়েছে। এর বাইরে যদি আর কোনো জাদু থেকে থাকে তাহলে কর্র্তৃপক্ষ আমাদের মতো আমজনতার সুবিধার জন্য ব্যাখ্যা করলে কৃতজ্ঞ থাকব।
আইপিওতে আসার ব্যাপারে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা দরকার মার্চেন্ট ব্যাংককে তো প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রণোদনা দিতে হবে। ইতিমধ্যে অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু যেটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ তাহলো শিল্প মালিকদের আন্তরিকতা। এ সংক্রান্ত যখনই কোনো সেমিনার হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায যে, শিল্প বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এ সংক্রান্ত কথিত অন্তরায় অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। আইপিওতে যেতে হলে বা প্রসপেক্টাস তৈরি করতে হলে কী কী উপাদান বা নিয়মাবলি মানতে হয়, তা এখন বিশ্বব্যপী বিস্তৃত। নতুন করে ভাবার তেমন কিছু নেই। সময় লাগার ব্যাপারটি তাদের আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করবে। এ রকমও দেখা গেছে যে একটি শিল্পগোষ্ঠীর খুব চাঙ্গা প্রতিষ্ঠানটিকে তারা আইপিওতে আনছেন না। তুলনামুলক দুর্বল প্রতিষ্ঠানটিকে জনগণকে খাওয়াতে চাচ্ছেন। ফলে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজারে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে। নিত্যনতুন তথ্য আবিষ্কার করে শেয়ার বাজারের পরিস্থিতি যেন আর জটিল করা না হয়। শেয়ার বাজার চলুক সহজ নিয়মনীতির ভিত্তিতে।
লেখক : বাংলাদেশের প্রথম সরকারের কর্মকর্তা শেয়ার বাজার, ব্যাংক ও বীমা খাত বিশ্লেষক