জাল সনদে ১২ বছর চাকরি!

জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পর এমপিও স্থগিত হলেও সরকারি কোষাগারে ফেরত যায়নি ১০ লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা। পাঁচ বছরেও হয়নি চাকরির কার্যকর নিষ্পত্তি, শূন্য হয়নি পদ—আটকে আছে নতুন শিক্ষক নিয়োগও।

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫২ পিএম

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক স্নিগ্ধা রানী দাস জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ নিয়ে প্রায় ১২ বছর সরকারি বেতন-ভাতা বা এমপিও গ্রহণ করেছেন বলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। সনদটি জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর তার এমপিও স্থগিত করা হলেও সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া ১০ লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে চাকরি থেকে অব্যাহতি বা তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিআইএর নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্নিগ্ধা রানী দাস ২০১২ সালে এমপিওভুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করে ডিআইএ। ওই সময় পর্যন্ত তিনি সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ ১০ লাখ টাকার বেশি গ্রহণ করেছেন বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।

পরে তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাই করা হলে সেটি জাল হিসেবে শনাক্ত হয়। শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে যাচাই করে ডিআইএ দেখতে পায়, স্নিগ্ধা রানী দাসের দাখিল করা নিবন্ধন সনদের নম্বরের বিপরীতে প্রকৃত সনদধারী হিসেবে দেলোয়ার হোসাইন চৌধুরীর নাম রয়েছে।

ফলে ওই সনদ ব্যবহার করে স্নিগ্ধা রানীর শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তার এমপিও ইনডেক্স নম্বর ১০৬৮৮৫৪।

জাল সনদ শনাক্ত, তবু ফেরত যায়নি সরকারি অর্থ

ডিআইএর নিরীক্ষায় জাল সনদের বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর স্নিগ্ধা রানী দাসের এমপিও স্থগিত করা হয়। তবে অবৈধভাবে গ্রহণ করা সরকারি বেতন-ভাতার অর্থ ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও প্রায় পাঁচ বছর পরও সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

এদিকে জাল সনদের কারণে তার নিয়োগ বৈধ নয় বলে নিরীক্ষায় উঠে এলেও চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। ফলে একদিকে তিনি এমপিও সুবিধা হারিয়েছেন, অন্যদিকে তার পদটিও শূন্য হিসেবে গণ্য না হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়নি।

শিক্ষক না থাকায় পাঠদানে সংকট

স্নিগ্ধা রানী দাসের পদটি শূন্য না হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কাছে চাহিদা পাঠানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।

বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একজন শিক্ষকের পদ কার্যত আটকে থাকায় এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমেও।

পাঁচ বছরেও হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা

জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শাখার ১৮ মে ২০২৩ সালের এক চিঠিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ওই নির্দেশনায় জাল সনদধারীদের এমপিও বন্ধ, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা, অবৈধভাবে গ্রহণ করা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ফৌজদারি মামলা করার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

তবে ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের স্নিগ্ধা রানী দাসের ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা মামলা করার কোনো নির্দেশনা পাইনি। তাছাড়া মামলার খরচাপাতি কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়েও আমাদের কোনো ধারণা নেই।’

তিনি আরও বলেন, স্নিগ্ধা রানী দাসের পদটি এখনো শূন্য হয়নি। এ কারণে ওই পদের বিপরীতে এনটিআরসিএতে শিক্ষক চাহিদা পাঠানোরও সুযোগ নেই।

ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “আমি অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হয়েছি বেশিদিন হয়নি। সেভাবে বিষয়টি জানি না। তবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

জাল সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ, দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে চাকরির বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি অর্থ ফেরত আসবে কবে, আর স্নিগ্ধা রানী দাসের পদটি শূন্য করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে কবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত