রাজধানীর বারিধারায় ডিপ্লোমেটিক জোনে সড়কের ফুটপাতে প্রাইভেট কার চাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানের (২৪) মৃত্যুর ঘটনায় ওই গাড়িতে থাকা কিশোরকে (১৭) অবশেষে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার বিকেলে দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ওই কিশোরকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন। পরে রাতে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। দুর্ঘটনার সময় সে-ই প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে গতকাল বুধবার গুলশানের বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় গুলশান থানা পুলিশ। ওই কিশোর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন আব্বাস আলী শরীফের ছেলে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই আরেফিন ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় এক কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যেহেতু ভিডিও ফুটেজে দুর্ঘটনার সময় চালকের আসনে তাকে দেখা গেছে। গাড়িটির প্রকৃত চালক আকাশ মারক (৪৪) পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
জানা গেছে, ওই কিশোর গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তার বাবা আব্বাস আলী শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন। তবে দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।
কাজ শেষে মঙ্গলবার বিকেলে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী হাসান। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার ওঠে যায় সেই ফুটপাতে। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান মেহেদী। গাড়িটির নিচে চাপা পড়ার উপক্রম থেকে বেঁচে যান আরও দুজন। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গাড়ির নিচ থেকে মেহেদীর রক্তাক্ত দেহ বের করে আনেন। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে ছুটে আসেন নিহতের ভাই।
দুর্ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর গাড়ি থেকে দুই ব্যক্তি নেমে আসেন। গাড়ির ডান পাশ অর্থাৎ চালকের আসন থেকে কালো টি-শার্ট পরা কিশোরকে নামতে দেখা যায়। গাড়ির অপর পাশ থেকে নামেন শার্ট পরা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। দুর্ঘটনার পর আশপাশের লোকজন কিশোরকে আটক করে পুলিশে সোপার্দ করেন। পুলিশও তাকে এবং গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু মুচলেকা নিয়ে রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। মামলায়ও একমাত্র আকাশ মারককে আসামি করা হয়। চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আসামি করা হয়নি। পরে গতকাল বিষয়টি জানাজানি হলে এবং দুর্ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। এর পরই গুলশান থানা পুলিশ ওই কিশোরকে হেফাজতে নেয়।
প্রকৃত ঘটনা আড়ালের নেপথ্যে ওসি (তদন্ত) : দুর্ঘটনায় জড়িত কিশোরকে আটকের পর ছেড়ে দেওয়া, এজাহারে তার নাম না রাখা এবং পুরো ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার পেছনে রয়েছেন গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন। কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তিনি এমনটি করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন।
ওই দিন দুর্ঘটনার খবরে ঘটনাস্থলে যায় গুলশান থানা পুলিশের একটি টিম। টিমের সদস্যরা লাশ উদ্ধার, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রকৃত ঘটনা জানেন এবং দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কার ও কিশোরকে থানায় নিয়ে যান। এরই মধ্যে থানায় ছুটে আসেন নিহতের পরিবার ও কিশোরের পরিবারের সদস্যরা।
দুর্ঘটনার স্থলে যাওয়া এক পুলিশ সদস্য বলেন, কিশোরের চাচাসহ পরিবারের কয়েকজন থানায় ছুটে আসেন। যেহেতু সেদিন ওসি ছিলেন না, তাই দায়িত্বে ছিলেন পরিদর্শক তদন্ত ইসমাইল হোসেন। কিশোরের পরিবারের সদস্যরা পরিদর্শক ইসমাইলকে ঘটনাটি মিটমাট করে দিতে অনুরোধ করেন। ইসমাইল তখন তাদের জানান, বাদী পক্ষ না চাইলে আমার কিছু করার নাই। এরপর কিশোরের চাচাসহ অন্যরা নিহত মেহেদীর ভাইকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনিও কোনোভাবে রাজি হচ্ছিলেন না, ভাইয়ের শোকে কান্নাকাটি করছিলেন। অন্তত মামলার এজাহারে যাতে কিশোরকে আসামি করা না হয় পরিদর্শক তদন্তকে ফের এমন প্রস্তাব দেয় কিশোরের পরিবার। পরে পরিদর্শক ইসমাইল হোসেন নিহতের ভাই মোক্তাদিরকে বলেন, প্রাইভেট কারের চালক তো আকাশ মারক। সে-ই দায়ী। সে কেন আরেকজনকে গাড়ি চালাতে দিবে। এসব বুঝিয়ে এবং আইনের ধারা দেখিয়ে এজাহারে শুধুমাত্র আকাশ মারককে আসামি করতে বলেন। ফলে কম জানাশোনা মোক্তাদির সেভাবেই মামলা করেন। শুধু তাই নয়, ময়নাতদন্ত না করেই হস্তান্তর করা হয়েছে মরদেহ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল পরিদর্শক ইসমাইল হোসেন বলেন, ওই কিশোরকে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনার সময় সে যে চালকের আসনে ছিল, তা আমরা জানতে পারিনি। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় তাকে দেওয়া হয়েছে। মুচলেকায় উল্লেখ ছিল তদন্তের প্রয়োজনে ওই কিশোরকে ডাকলে পরিবার তাকে হাজির করবে এবং তা-ই হয়েছে। কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার শিকার লাশের ক্ষেত্রে চিকিৎসক মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘দুর্ঘটনা’ লিখে দেন। সেক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের প্রয়োজন পড়ে না।
এদিকে আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিশোরকে গতকাল আদালতে হাজির করতে পারেনি পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার তাকে শিশু আদালতে হাজির করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে নিহতের মরদেহ মঙ্গলবার রাতেই গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে নিয়ে যান তার ভাই। তাকে ফোন করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।