লিবিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিকে অপহরণ করে নির্যাতন, ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক ইদ্রিস আলীকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে এক মাসের বেশি সময় আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার দুজন হলেন উত্তম সরকার ওরফে সুমন ও মর্জিনা বেগম। 

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পিবিআই এর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়। পোস্টে বলা হয় চক্রটি লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের টার্গেট করে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, নির্যাতন এবং বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায় করত।

২০২৫ সালের ১৭ মার্চ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বাসার সামনে ইদ্রিস আলীকে তিনটি গাড়িতে করে আসা অস্ত্রধারীরা অপহরণ করে। অপহরণকারীরা তার চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেয় এবং পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও অন্যান্য কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়।

প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা গাড়িতে নেওয়ার পর তাকে অজ্ঞাত একটি ভবনের কক্ষে আটকে রাখা হয়। দুই দিন পর তাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয় এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ইমোতে ভিডিও কলের মাধ্যমে তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে দেখানো হয়। এ সময় ইদ্রিসকে হত্যার হুমকি দিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

স্বামীর জীবন বাঁচাতে ফাতেমা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে একই দিন শিপন মিয়া নামে এক ব্যক্তির ইসলামী ব্যাংক হিসাবে ২০ লাখ টাকা পাঠান। টাকা পাওয়ার পর দুই দিন ইদ্রিসকে মারধর করা হয়নি। পরে অপহরণকারীরা আবারও নির্যাতন শুরু করে এবং আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করে।

পিবিআই জানায়, লোহার রড দিয়ে মারধরের কারণে ইদ্রিসের ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। তাকে দিনে মাত্র একটি রুটি ও এক বোতল পানি দিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে রাখা হতো।

পরবর্তীতে মুক্তিপণের দাবিতে আরও টাকা পাঠানো হয়। গত বছরের ৬ এপ্রিল ইদ্রিসের মেয়ে মাহফুজা বেগমের জনতা ব্যাংক হিসাব থেকে আরটিজিএসের মাধ্যমে মঞ্জু নামে একটি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক হিসাবে ২৮ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৪ লাখ টাকা রেখে বাকি ২৪ লাখ টাকা পরদিন মর্জিনা বেগমের ইসলামী ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। একই সময়ে আসামিদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে আরও আড়াই লাখ টাকা পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।

এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর ৮ এপ্রিল ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় ইদ্রিসকে চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২২ জুলাই দেশে ফেরেন তিনি।

এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী গত ১৫ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় পরদিন তদন্তভার নেয় পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এসআই মফিজুল ইসলামকে।

পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে উত্তম সরকার ওরফে সুমন এবং মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

পিবিআই বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের টার্গেট করে অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন এবং স্বজনদের ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের একটি চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত