তিন মাস পর কোথায় যাবে পরিবারটি, মাথা গোঁজার ঠাঁই চান দিনমজুর আশরাফ

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

নিজের নামে একটুকরো জমিও নেই। বাঁশের খুঁটি, বনের বেড়া আর টিনের চালের জরাজীর্ণ একটি ছাপরা ঘরই তার পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। সেই ঘরেই স্ত্রী, তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ে ও এক স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে বসবাস করছেন ৫৭ বছর বয়সী দিনমজুর আশরাফ আলী। অন্যের জায়গায় কোনোভাবে মাথা গুঁজে এত দিন সংসার চললেও এবার সেই আশ্রয়টুকুও ছাড়তে হচ্ছে তাকে।

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর এলাকার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া মহল্লার বাসিন্দা আশরাফ আলীকে তিন মাসের মধ্যে ঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। জায়গার মালিক সেখানে বাড়ি নির্মাণ করবেন। কিন্তু ঘর সরিয়ে নেওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোথায় থাকবেন, সেই চিন্তায় এখন দিশেহারা এই পরিবার।

আশরাফ আলী মৃত শুকুর মাহমুদের ছেলে। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি তিন মেয়ে কলেজে পড়ছেন। একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়লেও সংসারের অভাবের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি চাঁচকৈড় বাজারের একটি দোকানে কাজ করে। পরিবারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণের প্রধান দায়িত্ব আশরাফের কাঁধে।

দিনমজুরির কাজ করেই চলে তার সংসার। কখনো ইট ভাঙেন, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আবার কখনো কৃষিশ্রমিকের কাজও করতে হয়। প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। যেদিন কাজ থাকে, সেদিন কোনোভাবে সংসারের খরচ মেটে। কাজ না থাকলে নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একই মহল্লার নওশের মোল্লার জায়গায় একটি ছোট ছাপরা ঘর তুলে প্রায় ১২ বছর ধরে বসবাস করছে আশরাফের পরিবার। জরাজীর্ণ ঘরটির অবস্থা খুবই নাজুক। সামান্য বৃষ্টি হলেই টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে। ঘরের মেঝেতে পানি জমে কাদায় পরিণত হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় টিনের চাল উড়ে যাওয়ার আশঙ্কাতেও আতঙ্কে থাকতে হয় পরিবারটিকে।

একটি ঘরেই পরিবারের সদস্যদের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা। তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ের আলাদা করে পড়ার কোনো জায়গা নেই। রাতে ঘুমানোর সময় হলে বই-খাতা গুটিয়ে রাখতে হয়। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন মেয়েরা। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন বাবা-মা।

এর মধ্যেই নতুন সংকট তৈরি হয়েছে পরিবারটিতে। জায়গার মালিক সেখানে বাড়ি নির্মাণ করবেন। তাই আগামী তিন মাসের মধ্যে ঘরটি সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিজেদের কোনো জমি না থাকায় এরপর কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা জানেন না আশরাফ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আশরাফ আলী বলেন, ‘জায়গার মালিক তাঁর বাড়ি করবেন, এটা তার অধিকার। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তিন মেয়ে কলেজে পড়ে, ছেলেটাও ছোট। সরকার যদি মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা আর একটা ঘর করে দেয়, সন্তানদের নিয়ে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন হাসান ও স্বাধীন তালুকদার বলেন, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টে বসবাস করছে। নিজেদের কোনো জমি নেই, আয়ও অনিয়মিত। সরকারি পুনর্বাসন বা আবাসন সহায়তা পেলে পরিবারটির একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনাও নিরাপদ পরিবেশে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। সরকারি কোনো সহায়তার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আশরাফ আলীর পরিবারের কাছে জরাজীর্ণ ওই ঘরটি শুধু একটি থাকার জায়গা নয়; এটিই তাদের দীর্ঘদিনের ঠিকানা। সেই ঘরেই সন্তানদের পড়াশোনা, সংসার আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু তিন মাস পর সেই আশ্রয়টুকুও থাকবে না। এখন পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা, সময় ফুরানোর আগেই সরকারি সহায়তায় মিলবে একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত