একসময় বর্ষার আগমনী বার্তায় কুমিল্লার মুরাদনগরের নদী, খাল-বিল আর জলাশয়গুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠত ঝাঁকি জালের ছন্দে। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে জাল চেপে পানির ধারে ছুটতেন পেশাদার জেলে ও শৌখিন মাছশিকারিরা। টলটলে পানিতে বৃত্তাকারে জাল ছুড়ে মাছ ধরার সেই নান্দনিক দৃশ্য ছিল গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই চিরচেনা রূপ।
গোমতী, তিতাস ও আর্সি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা মুরাদনগরে এখন ঝাঁকি জাল প্রায় অদৃশ্য। জলাশয় ভরাট আর দেশি মাছের তীব্র সংকটে পড়ে অনেক জেলেই বংশ পরম্পরার এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী এই মাধ্যমটি আজ বিলুপ্তির পথে।
অন্যদিকে দেশের খাল, বিল ও নদীতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে আধুনিক ও ক্ষুদ্র ফাঁসের ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। বিশেষ করে ‘চায়না দুয়ারি’ বা ‘ম্যাজিক জাল’ নামে পরিচিত এক ধরনের মরণফাঁদে এখন নির্বিচারে আটকা পড়ছে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ও পোনা। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ শিকারের আশায় জেলেদের একটি অংশ এই জালের দিকে ঝুঁকছে, যা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ। গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্থানীয়ভাবে চায়না দুয়ারি জাল নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত মাছ ধরার বিশেষ এক ধরনের ফাঁদ।
কোথাও কোথাও একে চায়না জাল, ম্যাজিক জাল বা ঢলুক জালও বলা হয়। ছোট ফাঁসের কারণে এতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পাশাপাশি মাছের পোনাও আটকা পড়ে। স্থানীয়রা জানান, আধুনিক জালের বিস্তার, জলাশয়দূষণ ও নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশি মাছের সংখ্যা কমছে। এর প্রভাব পড়েছে ঝাঁকি জালের ব্যবহারেও।
যেভাবে ব্যবহার হয় ঝাঁকি জাল : প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় মাছ ধরার জনপ্রিয় উপকরণ ঝাঁকি জাল। সাধারণত জালের সঙ্গে সাত-আট হাত লম্বা একটি সরু রশি বাঁধা থাকে। জালের নিচের অংশে লোহা বা সিসার ছোট ছোট ওজন যুক্ত থাকে। পানিতে ছুড়ে দিলে ওজনের কারণে জাল দ্রুত তলিয়ে গিয়ে মাছ আটকে ফেলে। নদী, খাল কিংবা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে রশি হাতে রেখে জালটি পানিতে ছুড়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর রশি ধরে টেনে জাল তুলে আনা হয়। এতে পুঁটি, চিংড়ি, রুই, কাতলা, গ্লাসকার্প, শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে।
জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত : রামচন্দ্রপুর বাজারের মন্টু মিয়া বলেন, একসময় ঝাঁকি জাল দিয়ে অনেক মাছ ধরেছি। তখন জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ ওঠে না। তাই এই জালের ব্যবহারও কমে গেছে। ডুমুরিয়া গ্রামের জেলে নিখিল বর্মণ বলেন, তিতাস নদীতে সারা দিন ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরলেও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মাছ পাওয়া যায়। এতে সংসার চালানো কঠিন। আবার ঝাঁকি জাল চালাতেও শারীরিক শক্তি লাগে। তাই এখন এর চাহিদা আগের মতো নেই।
গাজীরহাট এলাকার জেলে স্বপন মিয়া বলেন, আধুনিক বিভিন্ন ধরনের জাল আসায় ঝাঁকি জালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। একসময় এই জাল দিয়ে খাল-বিলে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চালিয়েছি। দিন যত যাচ্ছে, পুরনো সেই স্মৃতিগুলোও ততই মুছে যাচ্ছে।
মাছ কমার সঙ্গে হারাচ্ছে ঐতিহ্যও : মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট, ম্যাজিক ও চায়না জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয়দূষণ, নদ-নদীর নাব্য হ্রাস, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং নদী-সংলগ্ন খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়ায় দেশি প্রজাতির মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। দেশি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি এসব কারণেই ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ শিকারের ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুমন লাল দেবনাথ এ প্রসঙ্গে জানান, কারেন্ট ও চায়না দুয়ারির মতো মারাত্মক ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশি মাছের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিলুপ্তির পথে বসছে ঐতিহ্যবাহী ঝাঁকি জাল। দেশীয় প্রজাতির মাছ বাঁচানো এবং জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষা করতে মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তবে শুধু অভিযানই নয়, নদী-নালা ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করার বিষয়টিও এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।