একসময় পদ্মার বুকে জাল ফেললেই উঠত রুপালি ইলিশ। ভরা মৌসুমে নদী ও মাছের ঘাট থাকত কর্মচাঞ্চল্যমুখর। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দিনভর জাল ফেলেও কাক্সিক্ষত ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। মাছ ধরায় আয় কমে যাওয়ায় কেউ ঋণের বোঝা টানছেন, কেউ চলে যাচ্ছেন বিকল্প পেশায়। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে এমন সংকটে পড়েছেন শত শত জেলে। মাছ না পেয়ে জাল-নৌকা বিক্রি করে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন কেউ কেউ।
একসময় পদ্মার বুকে জাল ফেলেই সংসার চালাতেন জেলে লিটন। ভোরে নৌকা নিয়ে নদীতে যেতেন, ফিরতেন ইলিশ নিয়ে। সেই মাছ বিক্রির টাকায় চলত সংসার। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। পদ্মায় জাল ফেলেও কাক্সিক্ষত ইলিশ মেলে না। মাছ ধরার পেশায় আয় না থাকায় শেষ পর্যন্ত নৌকা ও জাল বিক্রি করে একটি রিকশা কিনেছেন তিনি। লিটন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দড়িকান্দি গ্রামের কার্ডধারী জেলে। এখন নদীর বদলে সড়কে রিকশা চালিয়েই দিন চলে তার।
লিটন বলেন, ‘নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই নৌকা ও জাল বিক্রি করে একটি রিকশা কিনেছি। এখন রিকশা চালিয়েই সংসার চালাই।’
লিটনের মতো হরিরামপুরের শত শত জেলের জীবিকায় নেমে এসেছে এমন সংকট। ইলিশের ভরা মৌসুমেও পদ্মায় নেই ইলিশের সেই চিরচেনা ঝাঁক। দিনভর জাল ফেলেও কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ায় কেউ ঋণের বোঝা টানছেন, কেউ বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৪৬ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ১৫৯ টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ১২২ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯০ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড় ধস নেমে আহরণ দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ টনে। অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ টন। শতকরা হিসাবে কমার হার ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
হরিরামপুরের রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, ‘আগে মাছ ধরেই সংসার চালাতাম। এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই।
কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরতে হয়। শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’ নদীর গভীরতা কমে যাওয়াকেও ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ মনে করেন ফারুক।
হারুকান্দি ইউনিয়নের ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লা বলেন, ‘আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ নেই। নদীর গভীরতা কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের শব্দেও মাছ ভয় পেতে পারে। এসব কারণেই নদীতে মাছ কমে গেছে বলে মনে হয়।’
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের বিচরণ ও প্রজননের সঙ্গে নদীর পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি, পানিদূষণ, খাদ্যের সংকট, মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারিতে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার কারণেও প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ রক্ষায় জেলায় ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ৩ টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত মামলা হয়েছে ১০৯টি। জেল দেওয়া হয়েছে ৭০ জনকে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নূরুল ইকরাম বলেন, প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণেও ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব পড়তে পারে। ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, নদীতে চর সৃষ্টি, জাহাজ চলাচল ও নদীদূষণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি দিয়ে মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করছে। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ‘নদীর নাব্য কমে যাওয়া, নদীদূষণ, মানুষের অসচেতনতা এবং কিছু মৌসুমি জেলের নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ শিকারের কারণে জেলার পদ্মা-যমুনায় ইলিশ কমে গেছে। তাই জেলেদের অনেকে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।’