সাক্ষাৎকার : ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

পর্যটনকে অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি করতে চাই

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩১ এএম

সরকার পর্যটন খাতের অবদান জিডিপির বর্তমান প্রায় ২-৩ শতাংশ থেকে ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।

গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে ডেপুটেশনে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (পলিসি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তিনি। পর্যটনের সম্ভাবনা, মহাপরিকল্পনা, বিনিয়োগ, কর সুবিধা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে কীভাবে দেখছেন?

উত্তর : সরকার পর্যটন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই বিবেচনাতেই আমরা কাজ করছি। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে এবার প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ পর্যটনকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কীভাবে দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা যায়, তা উপস্থাপন করা। পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন : বিদেশি পর্যটক কেন বাংলাদেশে আসবেন? আমাদের বিশেষ আকর্ষণ কী?

উত্তর : এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিসোর্সের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সমৃদ্ধ। নেপালে পাহাড় আছে, মালদ্বীপে সমুদ্র আছে; কিন্তু বাংলাদেশে নদী, সমুদ্র, পাহাড়, হাওর, বন সবই রয়েছে। রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমাদৃত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, রাঙ্গামাটির লেক, সিলেটের নয়নাভিরাম হাওর। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং মানুষের আতিথেয়তার ঐতিহ্যও রয়েছে। এসব সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কমপ্লিট প্যাকেজে উপস্থাপন ও বিদেশে প্রচার করতে পারলে বাংলাদেশকে নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এখন একজন পর্যটক শুধু একটি স্থান দেখতে চান না; একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা চান। স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি, পণ্য ও মানুষের জীবনযাপন সবকিছুকে একত্র করে পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করতে হবে। বেসরকারি খাতকে এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রশ্ন : পর্যটন মহাপরিকল্পনা বর্তমানে কোন পর্যায়ে?

উত্তর : আমরা এখন পর্যালোচনার পর্যায়ে আছি। পর্যালোচনা শেষে পর্যটন বোর্ড, মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলের অনুমোদনের প্রক্রিয়া রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা। মূল পরিবর্তন হবে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে। কোন পর্যটন ক্লাস্টারে দ্রুত কাজ করা সম্ভব, কোথায় পর্যটন সম্ভাবনা বেশি এবং কোথায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ রয়েছে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে পর্যটন গন্তব্যের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে।

প্রশ্ন : পর্যটনের অবদান জিডিপির ৬-৭ শতাংশে নেওয়া কতটা সম্ভব?

উত্তর : এক্ষেত্রে আমাদের স্বল্পমেয়াদি তিন বছর, পাঁচ বছর এবং দীর্ঘমেয়াদি ১০ বছরের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গা, এমনকি প্রতিটি গ্রামও পর্যটন গন্তব্য হতে পারে। একজন পর্যটক কোনো এলাকায় গেলে শুধু একটি স্থান দেখবেন না; তিনি স্থানীয় খাবার খাবেন, পণ্য কিনবেন, গাইড নেবেন এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হবেন। ফলে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।

স্থানীয় মানুষ গাইড, পরিবহন, খাবার, কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত হতে পারবেন। তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা গেলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উদ্যোক্তাও তৈরি হবে। একটি নদীতে একটি নৌকা চালু করাও ছোট বিনিয়োগ, কিন্তু সেটি কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হতে পারে। এভাবে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে এটি অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

প্রশ্ন : বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

উত্তর : পর্যটন খাতকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। ভূমি, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্র, বনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তৈরি করা।

প্রশ্ন : নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কী উদ্যোগ রয়েছে?

উত্তর : পর্যটনের জন্য নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও শুরু করেছি। একজন বিদেশি পর্যটক দেশে প্রবেশের সময় ইমিগ্রেশন পুলিশের আচরণ থেকেই বাংলাদেশের প্রথম অভিজ্ঞতা পান। পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সেবাও তার অভিজ্ঞতার অংশ। তবে জনবলের সংকট রয়েছে। পর্যটন বোর্ডেও জনবলের বড় ঘাটতি আছে। প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের কাজ চলছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।

প্রশ্ন : পর্যটনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা কীভাবে বাড়ানো হবে?

উত্তর : পর্যটনের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং কোথায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা যায়, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও নীতিমালা ও বিধিমালায় গুরুত্ব পাবে। বেসরকারি খাত থেকে ইতিমধ্যে আগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে। দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে পর্যটন খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

প্রশ্ন : বিদেশি পর্যটকদের জন্য ওয়ান-স্টপ পর্যটন প্যাকেজ চালু হবে কি?

উত্তর : পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরি করা মূলত বেসরকারি ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরদের কাজ। সরকার তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সুবিধা নিশ্চিত করবে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সুনামগঞ্জের হাওর, রাঙ্গামাটির পাহাড়সহ বিভিন্ন গন্তব্য নিয়ে তারা সমন্বিত প্যাকেজ তৈরি করতে পারে।

ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একজন পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন। আমরা চাই, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পর্যটনসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য হোক এবং পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ আরও নিরাপদ ও সুবিধাজনক করা হোক।

প্রশ্ন : পর্যটন খাতে সাম্প্রতিক বাজেটে কী ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে?

উত্তর : এবারের বাজেটে পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পর্যটন খাতে বিনিয়োগের জন্য ত্বরিত অবচয় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগকারীরা এ সুবিধা পাবেন। ফলে পরবর্তী বছরগুলোর করযোগ্য আয় কমে গিয়ে বিনিয়োগকারীর ওপর করের চাপ কমতে পারে। বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এর সুবিধা ৫-৭ বছর পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব।

এ ছাড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পর্যটন প্রচারে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটনসম্পদ বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা সম্ভব। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পর্যটন খাতে বিনিয়োগ ও প্রচার বাড়ানো এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরেও নতুন পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা।

আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে পর্যটনকে শুধু ভ্রমণের খাত হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমি দেশের মানুষ ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের বলব বাংলাদেশে আসুন, বাংলাদেশকে আবিষ্কার করুন। বাংলাদেশের গল্প হয়তো আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত