পর্যটনে অপার সম্ভাবনার কথা বক্তৃতায় আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বড় কোনো উদ্যোগ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় এসব বক্তব্য। চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারে যেসব হোটেল মোটেল কটেজ গড়ে উঠেছে, তার প্রায় সবই ব্যক্তিগত উদ্যোগে।
অবশ্য পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটনের বিকাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অনেক স্পট তৈরি করেছে, নিরাপত্তাও দিচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে মূলত সেনাবাহিনীর কল্যাণেই মানুষ দুর্গম স্পটগুলোতে যাওয়ার সাহস করছে।
কিন্তু বিশে^র দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার কিংবা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত বা পারকি সমুদ্রসৈকতে কি শৃঙ্খলা আছে? নেই। কার আগে কে দখল করবে সৈকত, তার জন্য মরিয়া অনেকে। একটু খালি জায়গা দেখলেই বেঞ্চ বা চৌকি ফেলে দখল হয়; কিংবা বসে ফুচকা ও চটপটির দোকান। একটু নিরিবিলি বসে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করবে কেউ, তেমন সুযোগ নেই। বিচজুড়ে হাতেহাতে থাকা অসংখ্য ক্যামেরার ক্লিকে পর্যটকদের প্রাইভেসি হয়ে যাও উধাও।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের পাশেই রয়েছে নৌবাহিনীর আওতাধীন ‘ওয়েস্ট পয়েন্ট’। একপাশে সৈকতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়, উল্টো দিকে সিমেন্টের পিলারের কাঁটাতারের বেষ্টনী। ফলে সবুজ ঘাসে বসে সাগরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। না, ‘ওয়েস্ট পয়েন্টে’ কোনো হকার নেই; কিংবা নেই ঝালমুড়ি বা ফুচকার দোকানের দখল। ফলে মানুষ পরিবারের সবার সঙ্গে বসে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। উভয় স্পট কিন্তু একই এলাকায়। শুধু ব্যবস্থাপনাগত পার্থক্য ও শৃঙ্খলার কারণে একটি স্পটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বা নিরাপদ; আর অন্য স্পটে যেতে কারও মন চাইবে না।
পাহাড়, নদী, সমুদ্র, দ্বীপ কী নেই বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে? প্রকৃতি যেন উদার হয়ে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। দেশের একক বৃহত্তম বনাঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশে^র দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি মহেশখালীর সোনাদিয়া ও হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপসহ অসংখ্য স্পট ছড়িয়ে রয়েছে এই এলাকায়। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে এসব এলাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগানোর তেমন উদ্যোগ নেই।
এই পিছিয়ে থাকার প্রসঙ্গ টেনে চিটাগং চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই চট্টগ্রামে কি একটা আঞ্চলিক মানের বিমানবন্দর রয়েছে? পর্যটকরা দ্রুত আসা-যাওয়া করতে চায়। সেজন্য যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো আকাশ পথ। কিন্তু আমরা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ এতদিন নেইনি। এখন যদি আধুনিকায়ন করা হয়।’
তিনি বলেন, পর্যটনের জন্য যোগাযোগ উন্নত করা যে কত উপযোগী, তা দেখা যায় কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চালুর মাধ্যমে। আরও ১০টি ট্রেনও যদি এই রুটে চলাচল করে তাহলেও মানুষের চাহিদা থাকবে। অর্থাৎ যাতায়ত সহজ হলে পর্যটনের বিকাশও সহজ হবে।
চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী ও সমুদ্রে অনেক পর্যটন স্পট রয়েছে। মিরসরাইয়ে মহামায়া লেক, সীতাকু-ের ইকোপার্ক, সীতাকু- সমুদ্রসৈকত, চট্টগ্রামের ডিসি পার্ক, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, ফয়’স লেক, ফটিকছড়ির চা বাগানগুলো, আনোয়ারা পারকি সমুদ্রসৈকতসহ অসংখ্য পর্যটন স্পট রয়েছে। এ ছাড়া মাস্টারদা সূর্যসেন ও সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি ও ইউরোপিয়ান ক্লাবসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলো পর্যটন স্পটের আওতায় নিয়ে আসা যায়।
ডেভেলপার কোম্পানি উইকন প্রপার্টিজের পরিচালক স্থপতি মেহেদী ইফতেখার মনে করেন, পর্যটনের বিকাশে সবার আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা। পাবর্ত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার কারণে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গম স্পটগুলোয় পর্যটকের যাতায়াত বাড়ছে, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জোনভিত্তিক স্পট চূড়ান্ত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে যত দুর্গম অঞ্চলই হোক না কেন, পর্যটনের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।’
দেশের মানুষ পর্যটনবান্ধব নয় উল্লেখ করে এ পর্যন্ত ৩৬টি দেশ ভ্রমণ করা চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক এজাজ মাহমুদ বলেন, ‘আমি শ্রীলঙ্কায় সরকার পতনের দিনে সেখানে ছিলাম। সেদিন বিক্ষোভকারীরা আমাদের গাড়িকে পর্যটকবাহী ছিল বলে সম্মানের সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশে^র সব দেশেই সাধারণ মানুষ পর্যটকদের সম্মান দেয়। কিন্তু আমাদের এখানে ব্যতিক্রম।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্পটগুলোয় পর্যটকদের উপযোগী সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে। যদি না রাখা হয়, তাহলে পর্যটকরা কেন যাবে?’
পর্যটন শিল্পের বিকাশে দেশে ট্যুরিজম বোর্ড রয়েছে। এই বোর্ডের পরিচালক (বিপণন ও পরিকল্পনা) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশজুড়ে আমরা জোন ও থিমভিত্তিক পর্যটন স্পট গড়ে তোলার কাজ করছি। এ লক্ষ্যে আমরা একটি খসড়া মাস্টারপ্ল্যানও তৈরি করেছি এবং তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করব।’