গল্প শোনার টান সৃষ্টিতেই পর্যটনের বিকাশ

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৫ এএম

বাংলাদেশের পর্যটন নামে আমাদের মনে ভেসে ওঠে পরিচিত কিছু স্থান কক্সবাজারের উত্তাল তরঙ্গ, সিলেটের চা বাগানের সবুজ গালিচা কিংবা সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর অতিক্রম করেও কি আমাদের পর্যটন ভাবনা শুধু এই গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

দেশের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোয় আছে প্রাচীন প্রতœতত্ত্ব, জমিদারবাড়ি, ঐতিহাসিক উপাসনালয়, লোকসংস্কৃতি, নদী-হাওরের প্রাকৃতিক রূপ এবং গ্রামীণ জীবনধারা। এই বিশাল ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে এখনো সুপরিকল্পিতভাবে পর্যটন অর্থনীতিতে রূপান্তর করা যায়নি। যদি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনকে সাজানো যায়, তবে দেশের গ্রামীণ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

একটি দেশের পর্যটন কেবল প্রকৃতির ওপর ভর করে গড়ে ওঠে না। ইতিহাস, কৃষ্টি, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনধারা পর্যটনের মূল প্রাণশক্তি। দেশের প্রতিটি জেলার রয়েছে নিজস্ব গল্প। নওগাঁর সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) কেবল একটি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়; এটি প্রাচীন বাংলার শিক্ষা, জ্ঞান ও সভ্যতার বিশ্বমানের সাক্ষ্য বহন করে। বগুড়ার মহাস্থানগড় কোনো সাধারণ নগর ধ্বংসাবশেষ নয়, তা করতোয়া অববাহিকার প্রাচুর্যময় প্রাচীন নগরজীবন ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল। একইভাবে কুমিল্লার ময়নামতি-লালমাই অঞ্চল সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস ধারণ করে চলেছে।

পর্যটন শহরের বৈশ্বিক কার্যকর মডেলগুলো আমাদের সামনে থাকা সত্ত্বেও এসব অমূল্য সম্পদকে পর্যটনের অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়নি। আধুনিক অপসংস্কৃতির চর্চায় আমরা যতটা মন দিয়েছি, পর্যটন চর্চায় ততটাই উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছি।

এখানকার অতি সীমিত পর্যটন ব্যবস্থায় একজন পর্যটক একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটান, কয়েকটি ছবি তোলেন এবং ফিরে আসেন। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ভ্রমণ দিয়ে কোনো শক্তিশালী পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলা যায় না। পর্যটনের প্রতিটি স্থান ও স্থাপনার সঙ্গে চারপাশের জাদুঘর, লোকসংগীত, তাঁত ও মৃৎশিল্প, নৌসংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার এবং জনপদের প্রতিদিনের কৃষিজীবনকে সুতোয় বাঁধতে হবে। তখন পর্যটক কেবল একটি ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাবেন না; তিনি প্রবেশ করবেন একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার গল্পের ভেতর।

আমাদের নদীগুলো শুধু কৃষি, যোগাযোগ ও জীবিকার অংশ নয়; নদী নিজেই একটি বড় পর্যটন সম্পদ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, করতোয়া, গড়াই, মধুমতী, কপোতাক্ষ, কীর্তনখোলা, তিতাসসহ অসংখ্য নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নদীভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব। একটি নদীভ্রমণ হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা। সকালে নৌভ্রমণ, দুপুরে নদীর তীরে স্থানীয় খাবার, বিকেলে ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন, সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখা, রাতে লোকসংগীত এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় হস্তশিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজার। একজন পর্যটক যখন নদীতে নৌভ্রমণ করবেন, তখন শুধু নৌকার মাঝিই আয় করবেন না। আয় করবেন নৌযানের মালিক, স্থানীয় গাইড, রেস্তোরাঁ মালিক, হোটেল ব্যবসায়ী, কৃষক, জেলে, হস্তশিল্পী, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং ছোট দোকানদার। অর্থাৎ, নদী শুধু পানি বহন করে না; সঠিক পরিকল্পনায় নদী একটি সম্পূর্ণ স্থানীয় অর্থনীতিও বহন করতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ধানক্ষেতের বাতাস, খাল-বিল, মেঠোপথ কিংবা মাটির ঘরের দৃশ্য আমাদের কাছে ভীষণ পরিচিত। কিন্তু একজন বিদেশি পর্যটক কিংবা ইট-কাঠের খাঁচায় বন্দি শহুরে মানুষের কাছে এই সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনই এক অপার আকর্ষণ। ধানের ক্ষেত, খাল-বিলের ডিঙি নৌকা, মাটির ঘর, ঐতিহ্যবাহী গ্রামের হাট, শীতের পিঠা, কৃষিকাজ, তাঁত ও মৃৎশিল্প কিংবা সন্ধ্যায় বাউল ও লোকসংগীতের সুর এসবের প্রতিটি উপাদানই হতে পারে পর্যটনের একেকটি অমূল্য সম্পদ।

মানুষ এখন চায় শেকড়ের ছোঁয়া ও মৌলিক অভিজ্ঞতা। সপ্তাহান্তে শহরের কোনো পরিবার যদি একটি গ্রামীণ পরিবেশে গিয়ে দিন কাটাতে পারে, স্থানীয় কোনো পরিবারে মেহমান হয়ে থাকা, ভোরে কৃষকের সঙ্গে মাঠে যাওয়া, ঘরের তৈরি টাটকা গ্রামীণ খাবারের স্বাদ নেওয়া, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, স্থানীয় হাটের কোলাহল উপভোগ করা, আর রাতে উঠানে বসে বাউল গান শোনা, তবে সেই ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, হয়ে ওঠে জীবন উদযাপনের অংশ। এ ধরনের ‘রুরাল ট্যুরিজম’ বা গ্রামীণ পর্যটন গড়ে তুলতে বিশাল অঙ্কের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন কেবল মৌলিক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো।

যে জেলায় বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি, সেখানে হয়তো প্রকৃতি এখনো অক্ষত। যে জেলায় অতিরিক্ত নগরায়ণ হয়নি, সেখানে হয়তো গ্রামীণ পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। যে জেলায় পুরনো স্থাপনা টিকে আছে, সেখানে ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গড়ে উঠতে পারে। যে জেলায় নদী, বিল কিংবা হাওর রয়েছে, সেখানেও জলভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পর্যটন মানেই বড় হোটেল, রিসোর্ট কিংবা বিনোদনকেন্দ্র নয়। একটি পর্যটন গন্তব্য  তৈরির প্রথম শর্ত হলো নিরাপদ যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যটকের নিরাপত্তা, মানসম্মত শৌচাগার, বিশ্রামের ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত স্থানীয় পথপ্রদর্শক এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য। এরপর পর্যটকের চাহিদা অনুযায়ী হোটেল, রিসোর্ট, অতিথিশালা কিংবা পারিবারিক আবাসন গড়ে উঠবে। অর্থাৎ আগে গন্তব্যের পরিকল্পনা, পরে বাণিজ্যিক স্থাপনা।

 যে এলাকায় পর্যটন হবে, সেই এলাকার মানুষ যদি পর্যটনের সুফল না পায়, তাহলে সেই পর্যটন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই স্থানীয় জনগণকে পর্যটনের দর্শক নয়, অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন পথপ্রদর্শক করা যায়। স্থানীয় নারীদের পারিবারিক আবাসন, খাবার ও হস্তশিল্পের উদ্যোক্তা করা যায়। কৃষক স্থানীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে পারেন। জেলে নদীভিত্তিক পর্যটনের অংশ হতে পারেন। লোকশিল্পী স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। কারুশিল্পী তৈরি করতে পারেন স্থানীয় স্মারকপণ্য। ফলে একজন পর্যটকের ব্যয় সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। এটাই পর্যটনের প্রকৃত শক্তি।

আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোও দেশের নতুন পর্যটন মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকা থেকে বিমানে একটি আঞ্চলিক শহরে গিয়ে সেখান থেকে সড়ক বা নৌপথে কয়েকটি পর্যটন গন্তব্য ঘুরে অন্য একটি বিমানবন্দর দিয়ে ফিরে আসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাজশাহীকে কেন্দ্র করে নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পর্যটন। যশোরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট ও কুষ্টিয়ার পর্যটন। সৈয়দপুরকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গন্তব্য। বরিশালকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও জলভিত্তিক পর্যটন। এভাবে বিমান, সড়ক ও নৌপথকে একসঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের সময় কমবে, ভ্রমণের সুযোগ বাড়বে এবং নতুন গন্তব্যগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। এক্ষেত্রে বিমান সংস্থা, হোটেল, পর্যটন প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি গন্তব্যের জন্য প্রয়োজন হতে পারে পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, স্থানীয় পথপ্রদর্শক প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটকের নিরাপত্তা, স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা, হস্তশিল্পের বাজার, পারিবারিক আবাসন এবং দেশ-বিদেশে প্রচারের ব্যবস্থা সরকার সবকিছু নিজে করবে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আধুনিক পর্যটক শুধু একটি জায়গা দেখতে চান না; তিনি একটি অভিজ্ঞতা চান। পাহাড়পুর তাই শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয় এটি প্রাচীন বাংলার শিক্ষা ও সভ্যতার গল্প। মহাস্থানগড় শুধু ধ্বংসাবশেষ নয় এটি হাজার বছরের নগরসভ্যতার গল্প। ময়নামতি শুধু কিছু প্রতœস্থল নয় এটি প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার গল্প। একটি নদীভ্রমণ শুধু নৌকায় চলা নয় এটি নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবনকে অনুভব করার সুযোগ। অতএব আমাদের পর্যটনকে ‘স্থান দেখানো’ থেকে ‘অভিজ্ঞতা দেওয়া’র দিকে নিয়ে যেতে হবে।

পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি সমান গুরুত্ব পেতে হবে। নদী দখল করে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ, প্রতœস্থলের পাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ, জলাভূমি ভরাট, বন ধ্বংস কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতিকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ এসব শেষ পর্যন্ত পর্যটনের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

আমাদের সমুদ্র আছে, কিন্তু শুধু সমুদ্র দিয়ে পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করা যাবে না। পাহাড় আছে, কিন্তু শুধু পাহাড় দিয়েও নয়। আমাদের আছে নদী, প্রতœতত্ত্ব, ইতিহাস, গ্রাম, লোকসংস্কৃতি, স্থাপত্য, কৃষি, নৌসংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের আছে গল্প। দেশের ও বাইরের পর্যটকদের সেই গল্প শোনাতে হবে, দেখাতে হবে। বাংলাদেশের নতুন পর্যটন মানচিত্র আঁকার তাই এখনই সময়।

লেখক : মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত