রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয় থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ২৮০ থেকে ৩০০ নেতাকর্মীকে আটক করার কথা জানিয়েছে মতিঝিল জোনের ডিসি হারুনুর রশিদ। সেখানে ওই নেতাকর্মীরা ‘গোপন বৈঠক’ করছিলেন বলে অভিযোগ করে পুলিশ। গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটা থেকে দফায় দফায় তাদের আটক করা হয়। পুলিশের পাঁচটি প্রিজনভ্যানে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সরেজমিন জাসদের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রদলের কয়েকশ নেতাকর্মী জাসদের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছে। তারা ‘হই হই রই রই, আওয়ামী লীগ গেলি কই’, ‘ধরি ধরি ধরি না, ধরলে কিন্তু ছাড়ি না’, ‘আওয়ামী লীগের চামড়া, তুলে নিবো আমরা’ প্রভৃতি সেøাগান দিচ্ছেন।
জানা যায়, জাসদের কার্যালয় দখল নেওয়া এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার নেতৃত্ব দিয়েছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন। এ সময় পল্টন থানা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে রাখেন।
জাসদ কার্যালয় দখল ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুলিশে সোপর্দের বিষয়ে রবিউল ইসলাম নয়ন বলেন, গতকাল শনিবার সকালে আমাদের ‘নেটওয়ার্ক জালে’ আওয়ামী লীগের সেøাগান দিয়ে মিছিল করার বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নেন। পরে নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকজন জানতে পারেন জাসদ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে একত্র হয়ে সভা করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে আসার পর এতটুকু নিশ্চিত করেছি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ কোনো জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন; এটা করা যাবে না। সেই কারণে আমরা তাদের যাতে কোনো পাবলিক গায়ে হাত না দেয় এবং গায়ে হাত দিলে এত হাজার হাজার লোকের ভেতর একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সেটা সহযোগিতা করছি, যাতে কেউ গায়ে হাত না দেয়। অনেক বৃদ্ধ লোক আছেন, অনেক নারী আছেন, অনেক ইয়াং লোক আছেন; গায়ে হাত দিলে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেই দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেটাই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
এ সময় হুঁশিয়ারি দিয়ে নয়ন বলেন, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের ‘দোসররা’ যাতে ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে, সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।
জাসদ কার্যালয়ের সামনে গিয়েছিল জামায়াতের নেতাকর্মীরাও : জাসদের কার্যালয় থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুলিশ আটক করার সময় জামায়াতের বেশ কিছু নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জামায়াতের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পল্টন থানার সেক্রেটারি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শুরা সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা যখন শুনতে পেরেছি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে গেদারিং করছে, তখন পল্টন থানার আওতাধীন জামায়াতের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। পল্টন মোড় থেকে আমরা মিছিল নিয়ে জাসদ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছি। সেখানে অনেকক্ষণ ছিলাম, সন্ধ্যার পর ওখান থেকে চলে আসি।
এদিকে জামায়াতের উপস্থিতি নিয়ে যুবদল নেতা নয়ন বলেন, ‘পাকিস্তানিদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটা ১১ দলীয় জোট হয়েছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় ককটেল মারছে, বোমা মারছে। আপনারা জানেন, তারা নিজেরাও এটা স্বীকার করেছে। বিএনপি বলেছে, তাদের ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। কেন জিজ্ঞাসাবাদ করছে না; এটা আমাদের বোধগম্য নয়।
জাসদের দাবি প্রতিনিধি সভার আবেদন করা হয়েছিল, পুলিশ বলছে ‘জানা নেই’ : জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা ছিল গতকাল। সারা দেশ থেকে প্রায় ৩২০ নেতাকর্মী প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। তিনি দাবি করেন, প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে তাদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। সেখানে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন। পরে বিকেলে পুলিশ এসে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। তাদের কোনো নেতাকর্মী বের হতে পারেননি। পর্যায়ক্রমে সবাইকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ডিএমপি থেকে অনুমতি প্রসঙ্গে সাজ্জাত জানান, তারা এক মাস আগে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা করতে অনুমতি চাইলে ডিএমপি থেকে তা মঞ্জুর করেননি। পরে গুলিস্তানে জাসদ প্রধান কার্যালয় মাইক ব্যবহারের অনুমতি চাইলে ডিএমপি জানাব বলে আর জানায়নি।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জাসদ কার্যালয় থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যকে আটক করা হয়েছে। তিনি কেন সেখানে গিয়েছিলেন জানতে চাইলে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, উনি জাসদ সমর্থক। সে জন্য দলের কার্যালয়ে এসেছিলেন।
এদিকে সন্ধ্যায় ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জাসদ কার্যালয়ের সামনে এক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা একত্র হয়ে নাশকতার উদ্দেশ্যে অথবা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছিল। এই সংবাদ পেয়ে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। স্থানীয় ছাত্র-জনতা পুলিশকে সহযোগিতা করেছে। তিনি আরও বলেন, তারা আসলে কি উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছিল, এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তারা যে জয়-বাংলা সেøাগান দিয়েছে, সেই তথ্য আমাদের কাছে আছে। এ ছাড়া তারা আর কোনো কর্মকা- করেছেন কিনা সেসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কতজনকে আটক করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে আনুমানিক ২৮০ থেকে ৩০০ জন হবে। আমরা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে থানায় নিয়ে গেছি। যাচাই-বাছাই করে যার যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের নামে মামলা হবে, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে না, তাদের অন্য যে প্রক্রিয়া আছে আমরা সেই প্রক্রিয়া অবলম্বন করব।
পল্টন মডেল থানার ওসি আরিফুর ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কিছু লোকজনকে আনা হয়েছে থানায়। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জাসদ কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। অনুমতির বিষয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়, তারা প্রত্যেকেই এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।