জলাতঙ্ক এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা একদিকে অত্যন্ত প্রাণঘাতী, অন্যদিকে সঠিক সময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান এবং এসব মৃত্যুর অধিকাংশই এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটে। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুকুরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জলাতঙ্ক এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মানব জলাতঙ্কে ৫৬টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে রোগ শনাক্তকরণ ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে নথিভুক্ত সংখ্যা প্রকৃত মৃত্যুর পূর্ণ চিত্র নাও দিতে পারে। তাই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা নয়, প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, মানুষের সংস্পর্শের ঝুঁকি কমানো এবং সংস্পর্শের পর দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা- সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হয়।
জলাতঙ্ক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জলাতঙ্কের সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য হলো- রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর এটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। জলাতঙ্ক রোগটি মানবদেহের র্যাবিস নামক ভাইরাসের সংক্রমণের মাধ্যমে হয়ে থাকে, যা র্যাবিড (জলাতঙ্কে আক্রান্ত বা বাহিত) কোনো প্রাণী বিশেষত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজি, বানর ও বাঁদুর এর কামড় ও আঁচড় এমনকি মানবদেহে কোনো ক্ষত থাকলে তার সংস্পর্শে এসব প্রাণীর লালা বা শ্লেষ্মা আসলে মানবদেহে এই রোগটি ঘটতে পারে৷ অতি দুর্লভ ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে সৃষ্ট অ্যারোসল বাতাসের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির ফুসফুসে প্রবেশ করে৷ ঠিক একইভাবে গবাদিপ্রাণীও এই রোগে আক্রান্ত হয়। ভাইরাসটি ধীরে ধীরে প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্কে) পৌঁছায়, যার দরুন ফলে গলবিল এবং খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও আক্রান্ত হয় এবং লক্ষণ যেমন- অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক প্রবণতা, বিকৃত আওয়াজ, ক্ষুদামন্দা, শ্বাসকষ্ট, মুখ দিয়ে লালা পড়া ও অসারতা) প্রকাশ পেতে শুরু করে। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণী সুস্থ ব্যক্তি বা সুস্থ প্রাণী (যেমন, কুকুর, বিড়াল বা গবাদীপ্রাণী) কামড়ানোর ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে এ সময়সীমা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণী অবধারিতভাবে মৃত্যুবরণ করেন। জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি শুধু একটি প্রাণঘাতী রোগের সম্ভাব্য সংক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, রোগটির পেশাগত ঝুঁকি থাকার দরুন আক্রান্ত হলে এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বোঝাও তৈরি করতে পারে। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ২ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ জলাতঙ্কের সংস্পর্শে আসার পর পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস গ্রহণ করেন, যার অধিকাংশই এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায়। এই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ৮৬০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের ওপর উল্লেখযোগ্য মানসিক ও মনোসামাজিক প্রভাবও পড়ে।
পেশাগত ঝুঁকিতে কারা?
সাধারণ মানুষের তুলনায় কিছু পেশাজীবীর জলাতঙ্কের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বেশি। কারণ তাদের কাজের অংশ হিসেবে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন প্রাণী কিংবা সংক্রমিত টিস্যুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হয়।
ভেটেরিনারি ও প্রাণিস্বাস্থ্যকর্মীরা ভেটেরিনারিয়ানদের জন্য ঝুঁকিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ, আহত বা অস্বাভাবিক আচরণ করা প্রাণী পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের সময় কামড় বা আঁচড়ের পাশাপাশি আক্রান্ত প্রাণীর লালার সংস্পর্শ ঘটতে পারে।
বিশেষ করে-প্রাণীকে ধরে নিয়ন্ত্রণ করার সময়, মুখগহ্বর ও স্নায়বিক পরীক্ষা করার সময়, ক্ষত পরিষ্কার ও চিকিৎসা করার সময়, জরুরি চিকিৎসার সময়, সন্দেহভাজন প্রাণীর ময়নাতদন্ত করার সময় এবং মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্রের টিস্যু নিয়ে কাজ করার সময় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শুধু ভেটেরিনারিয়ানই নন- ভেটেরিনারি শিক্ষার্থী, হাসপাতালের সহকারী, প্রাণী নিয়ন্ত্রণকর্মী, কুকুর ধরার কর্মী, প্রাণীর টিকাদানকর্মী, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি এবং পরীক্ষাগারে জলাতঙ্ক শনাক্তকরণ বা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও কাজের ধরন অনুযায়ী ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারেন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি
মানুষ থেকে মানুষে জলাতঙ্ক সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। তবে সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত জলাতঙ্ক রোগীর লালা যদি কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক অথবা চোখ, নাক বা মুখের সংবেদনশীল ঝিল্লির সংস্পর্শে আসে, তাহলে সেটিকে সম্ভাব্য পেশাগত সংস্পর্শ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।
অতএব, শুধু পেশার নাম দিয়ে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করে কাজের ধরন, আক্রান্ত প্রাণী বা রোগীর সঙ্গে সংস্পর্শের সম্ভাবনা ও ঘনত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
১. ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের জন্য আগাম টিকাদান
যাদের কাজের কারণে জলাতঙ্কের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা নিয়মিত বা বেশি, তাদের জন্য সংস্পর্শের আগে প্রতিরোধমূলক টিকা (প্রি-এক্সপোজার টিকাদান) বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট পরীক্ষাগারকর্মী, প্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণকর্মী এবং জলাতঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগাম টিকা নেওয়া থাকলেও পরবর্তীতে সংস্পর্শ ঘটলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও নিরাপদ প্রাণী ব্যবস্থাপনা
সন্দেহভাজন প্রাণীর সঙ্গে কাজ করার সময় কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে প্রাণীকে নিরাপদভাবে ধরে রাখা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে মুখগহ্বর বা লালার সংস্পর্শ এড়ানো এবং দূষিত উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। ময়নাতদন্ত বা পরীক্ষাগারে কাজের সময় নির্ধারিত জীবাণু-নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আক্রান্ত প্রাণীর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের টিস্যুতে ভাইরাস থাকতে পারে।
৩. সংস্পর্শ ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা
কামড়, আঁচড় বা সম্ভাব্য সংস্পর্শ ঘটলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রথমে ক্ষতটি সাবান ও প্রচুর পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুঁয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সংস্পর্শের ঝুঁকি নিরূপণ করাতে হবে। ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজনে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা উপযুক্ত প্রতিরোধী ওষুধ দেওয়া হতে পারে। গুরুতর সংস্পর্শের ক্ষেত্রে দ্রুত সংস্পর্শ-পরবর্তী প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুকুরের টিকাদান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শুধু মানুষকে সংস্পর্শ-পরবর্তী প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ মানুষের অধিকাংশ জলাতঙ্ক সংক্রমণের উৎস কুকুর। তাই রোগের উৎসেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুকুরের মোট সংখ্যার অন্তত ৭০ শতাংশকে ধারাবাহিকভাবে টিকাদানের আওতায় আনা গেলে কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্কের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে কুকুর পালন, অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের মানবিক ব্যবস্থাপনা, রোগের নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততাও প্রয়োজন।
এক-স্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ কেন জরুরি?
জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে মানবস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কুকুরের টিকাদান, প্রাণীর রোগ শনাক্তকরণ, কামড়ের ঘটনা দ্রুত জানানো, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা দেওয়া এবং জনসচেতনতা- সবগুলো একই প্রতিরোধব্যবস্থার অংশ। তাই ভেটেরিনারি সেবা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণী নিয়ন্ত্রণকর্মী, পরীক্ষাগার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। এই সমন্বিত এক-স্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমেই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণকে আরও টেকসই করা সম্ভব।
জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি সহজ- রোগটি প্রাণঘাতী, কিন্তু সংস্পর্শের পর দ্রুত সঠিক ব্যবস্থা নিলে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। জলাতঙ্ক প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসক বা ভেটেরিনারিয়ানের দায়িত্ব নয়- মানুষ, প্রাণী ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই এর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
______
*অধ্যাপক মো. আহসানুল হক (রোকন)
পরিচালক, ওয়ান হেলথ্ ইন্সটিটিউট, সিভাসু
মনিটর, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশান (এগ্রি, চট্টগ্রাম ডিভিশান)