বুকের ব্যথায় অবহেলা নয়

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

বাংলাদেশে হৃদরোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও মাদকাসক্তি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি শুরু হতে পারে আরও ১৫ থেকে ২০ বছর আগে থেকে। বুকে ব্যথা বা জ্বালাপোড়াকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে অবহেলা করায় অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করেন, যা বাড়িয়ে দেয় মৃত্যুঝুঁকি। তবে দেশে হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসার সুযোগও রয়েছে এখন। হৃদরোগের ঝুঁকি, চিকিৎসাব্যবস্থা, ব্যয় ও হৃদরোগ প্রতিরোধের উপায় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী কনসালট্যান্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল ইসলাম।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হৃদরোগের পরিস্থিতি এখন কেমন?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে হৃদরোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্য দেশে অধিকাংশ হৃদরোগীর গড় বয়স ৬০ থেকে ৬৬ বছরের মধ্যে। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে ৩৫ থেকে ৪৫ অথবা ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সের রোগীরা হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে বেশি আসেন। আমরা নিজেরা কিছুদিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছি, তাতে দেখা যাচ্ছে এখানে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা ভয়ংকর পরিস্থিতিতে রয়েছে। এই বয়সের অধিকাংশ মানুষের হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফেকশন হচ্ছে। আগে ব্লাড প্রেসারটা আমাদের দেশে দেরিতে শুরু হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ব্লাড প্রেসারের রোগী কম বয়সেরও পাচ্ছি। সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সেই অধিকাংশ মানুষ চর্বির সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : হৃদরোগ থেকে সুস্থ থাকতে সচেতনতা কেমন হওয়া উচিত?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : হার্ট অ্যাটাক হয় রক্তনালীতে চর্বি জমে বা তেল জমে। রক্তনালীতে তেল বা চর্বি জমতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। তার মানে যে ব্যক্তির ৪৫ বছরে হার্টে সমস্যা হচ্ছে, তার শরীরে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তার বয়স যখন ২০ থেকে ২৫ বছর। দুঃখজনক বিষয় হলো, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, তারা কেউই হৃদরোগের ব্যাপারে সচেতন নন। তারা খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারেও সচেতন নন। তাদের সবচেয়ে পছন্দের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড, পিজ্জা ও বার্গার। এই বয়সের বাচ্চাদের আপনি এগুলো না খাইয়ে রাখতে পারবেন না। কিন্তু প্রতিদিন খাদ্যাভ্যাসে পিজ্জা-বার্গার না রাখে, মাঝে মাঝে সেটা রাখেন। তাহলে অল্প বয়সে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয় না। এ ছাড়া শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। বহির্বিশ্বে একটা কথা আছে ‘টারশিয়ারি প্রিভেনশন’ অর্থাৎ স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া যে, তোমার কোন খাবার খাওয়া উচিত, কোন খাবার না খাওয়া ভালো অথবা কম খাওয়া উচিত, সেটা শিক্ষা দেওয়া। আমাদের দেশে ইয়াবা অথবা এমফিটামিন খাওয়া হার্ট অ্যাটাকের বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। যখন মানুষ ইয়াবা খায়, তখন কিন্তু হঠাৎ উত্তেজনায় তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে যে, মাদক শুধু আপনার সামগ্রিক ক্ষতি করে না, হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ায়।

 দেশ রূপান্তর : একজন মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত কি না, তা প্রাথমিকভাবে কীভাবে বোঝা যাবে?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : সাধারণত বুকে যখন ব্যথা হয়, অনেকে বলেন, এটা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে হার্ট অ্যাটাকের যত রোগী আসে, তারমধ্যে ৯৯ ভাগ রোগীকে যখন জিজ্ঞাসা করি ‘আপনার বুকে ব্যথা কখন হয়েছিল?’। তারা বলেন, দুই, চার বা ছয় ঘণ্টা আগে। বলেন, ‘বেশি ব্যথা না, একটু বুক জ্বলতেছিল; ভাবছি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, তাই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়েছি। বুকে ব্যথা হলেই তা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা না, সেটা যে হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক ব্যথাও হতে পারে, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। আমরা বলি যে, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে ‘প্রতিটা মিনিটে আপনার হার্টের মাংসপেশি ধ্বংস হচ্ছে’। তাই হার্ট অ্যাটাক হলে যত তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসবেন, হার্টের মাংসপেশি তত ভালো থাকবে। এতে হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচার সুযোগ তত বেশি হবে। এ ছাড়া বুকজ্বলা শুধু বুকের মাঝখানে আছে, না হাতে অথবা গলার নিচে চলে যাচ্ছে, সেটা খেয়াল করতে হবে। শরীর ঘাম দিচ্ছে কি না, সেটা খেয়াল করতে হবে। এ ছাড়া আপনি যদি প্রেসার, ডায়াবেটিসের রোগী হন অথবা আপনি সিগারেট খান, সেক্ষেত্রে বুক জ্বলা-যন্ত্রণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশে বর্তমানে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার মান কেমন? কেন অনেক রোগী দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যেতে চায়?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : বাংলাদেশে এখন হার্টের সব চিকিৎসা আছে। হার্টের যত চিকিৎসা সারা বিশ্বে প্রচলন আছে, বাংলাদেশে তার সবগুলো করা সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হবে, সেটা আসলে ভুল ধারণা। বিশেষ করে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে হার্ট অ্যাটাক চিকিৎসার সব ধরনের সুবিধা আছে। হরহামেশা শুনি যে, ‘দেশে চিকিৎসক বলছে অনেকগুলো ব্লক, কিন্তু বিদেশি চিকিৎসক বলেছে কোনো ব্লক-ই নেই’; এই অবিশ্বাসের আর সুযোগ নেই। রক্তনালীতে কী পরিমাণ ব্লক, সেটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন শনাক্ত করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে হার্টের চিকিৎসার কী ধরনের সক্ষমতা আছে?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে হার্টের সব ধরনের চিকিৎসা হচ্ছে। বর্তমানে দুটি ক্যাথল্যাব চালু রয়েছে। দুটি ক্যাথল্যাবই অত্যাধুনিক এবং বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো কোনো হসপিটাল এগুলো এনেছে, এখানে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই আমাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিজামউদ্দিন হাসান রশিদ স্যারকে, এমন আধুনিক, এ আই-সহায়ক মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট আমাদের দেশে প্রথম বারের মতো আনার জন্য। আরও একটা ক্যাথল্যাবের কাজ শেষ, চালুর অপেক্ষায় আছে। আমাদের সিসিইউতে ২৫টি বেড, এইচডিইউতে ১৫টি বেড রয়েছে। এ ছাড়া প্রি-ক্যাথ, পোস্ট-ক্যাথে রয়েছে আরও ২০টাসহ একসঙ্গে ৫০ থেকে ৬০ জন হার্টের রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা। এ ছাড়া, আমাদের হাসপাতালের প্রত্যেকটা বেডের সঙ্গে অক্সিজেন রাখা অথবা মেডিকেল গ্যাসসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিাধা রাখা হয়েছে। যেকোনো বেডকে প্রয়োজনে সিসিইউ বেডে রূপান্তর করার সুযোগ আছে। বহির্বিশ্বে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে একটা চিকিৎসা প্রাইমারি পিসিআই। হার্ট অ্যাটাকের পরপর সরাসরি হসপাতালে যেতে হবে। সেখানে সরাসরি এনজিওগ্রাম করবে এবং প্রয়োজনে স্টেন্টিং করবে। এটার একটা টাইমফ্রেম আছে বা গোল্ডেন টাইম আছে, সাধারণত ১২ ঘণ্টার মধ্যে এই কাজ করতে হবে। সাধারণত প্রতিটা হাসপাতালে সকাল থেকে রাতের একটা সময় পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল গত এক বছরে একটা পাইলট প্রকল্প হিসেবে হাসপাতালে ২৪/৭ হৃদরোগের চিকিৎসা করেছি। কারণ এটা একটা বড় ধরনের অর্জন রাত তিনটা বা ভোর ছয়টায় চিকিৎসক উপস্থিত হতে হবে। একটা কার্ডিয়াক পিসিআই দলের সদস্য থাকে ১০-১২ জন। আমরা গত এক বছরে সব প্রাইমারি পিসিআই সফলভাবে করেছি। এ বছর ঘোষণা দিতে চাই, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ২৪ ঘণ্টায় সপ্তাহে সাত দিন হার্টের সব চিকিৎসা সম্ভব এবং প্রাইমারি পিসিআই-ও সম্ভব। আমরা বর্তমানে রোবট নিয়ে আসছি। আমাদের প্ল্যান ভবিষ্যতে রোবোটিক বাইপাস সার্জারি করার।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে হার্টের চিকিৎসা-ব্যয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে বাইরে কিনা?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : আমাদের ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান মইনুদ্দিন হাসান রশীদ স্যারের একটা কথা কোট করতে চাই, ‘এই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে কোনো রোগী চলে যাবে, সেটা উনি হতে দেবেন না’। এটা সত্য যে, প্রাইভেট বা করপোরেট হাসপাতালে খরচ বেশি হবে, এটা আপনাকে বুঝতে হবে, কারণ এখানে সার্ভিসটা বিশ্বমানের দেওয়া হয়। আমরা সব শ্রেণির মানুষের জন্য ব্যবস্থা রেখেছি। আমাদের হসপিটালে ফ্রি বেড থেকে শুরু করে, ওয়ার্ড, কেবিন চালু আছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যয়বহুল। নতুন সুযোগ-সুবিধা দিতে গেলে খরচ বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভালো উপায় প্রিভেনশন বা রোগ প্রতিরোধ। আমরা যদি স্কুলের বাচ্চাদের এবং যুবসমাজকে ফুড হ্যাবিট ও শরীরচর্চার বিষয়ে সচেতন করতে পারি, তাহলে হার্ট অ্যাটাক নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আগে দেশে ডাক্তার-রোগী সম্পর্কের কিছুটা ঘাটতি ছিল। ডাক্তারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : সাধারণ মানুষ কীভাবে হৃদরোগের মানসম্মত চিকিৎসা পেতে পারে?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট আছে। গত এক বছরে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বিনা টাকায় দিনে প্রাইমারি পিসিআই হয়েছে। এমনকি স্টেন্ট বা রিংয়ের টাকাও প্রয়োজন পড়েনি। ওই জায়গায় সরকারকে একটু উদ্যোগী হতে হবে এবং কিছু রিং কম দামে মার্কেটে আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোও যদি প্রাইমারি পিসিআইয়ের খরচ কিছুটা কমায়, তাহলে আমরা এগোতে পারব। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে অন্যান্য হাসপাতালের চেয়ে প্রাইমারি পিসিআইয়ের খরচ কম।

দেশ রূপান্তর : হার্টকে সুস্থ রাখার জন্য আমাদের শারীরিক বা প্রাত্যহিক জীবনে কী করণীয়?

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম : খাবারের ব্যাপারে একটু সচেতন হতে হবে। ভোজ্যতেলের উন্নত মান বজায় রাখার বিষয়ে সরকারের কঠোর হওয়া দরকার। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজেকে অন্তত ২০ মিনিট সময় দেওয়া প্রয়োজন। ২০ মিনিট শরীরচর্চা করা, হাঁটাচলা করা বা রুমের ভেতরে সাইক্লিং করা, যেন শরীরে ঘাম ঝরে, অতটুকু পরিশ্রম করলেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে আসে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত