নেই কোনো নীতিমালা রয়েছে কর ফাঁকি

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৮ এএম

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বাজার দিনে দিনে বড় হচ্ছে। গত দুই দশকে এই ব্যবসায় ছোট ও বড় স্থানীয় উৎপাদক, আমদানিকারক এবং শত শত ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা জড়িত হয়ে পড়েছে। গণপরিবহন হিসেবে এই অটো ঘিরে বহুমাত্রিক ব্যবসার অংশ হলো বডি, টায়ার, ব্যাটারি, মোটর, চার্জার, খুচরা যন্ত্রাংশ, ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজ। গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছতে একটি পূর্ণাঙ্গ অটো উৎপাদন থেকে বিক্রয় এবং বিক্রয়োত্তর রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই রয়েছে আয়ের সুযোগ। দ্রুত বর্ধনশীল এই খাত থেকে আয়ের ফায়দা বা মুনাফার সুযোগ নিতে এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এই তালিকায় রয়েছে ছোট গ্যারেজ, ওয়ার্কশপসহ আল মদিনা, হামকো, আকিজ, রানার, মেট্রোসেম, ডাইনামিক, হাইটেক এবং ইফাদের মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। চীনসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও কেউ কেউ রয়েছে এই খাতে। একইসঙ্গে উদ্ঘাটন হয়েছে করফাঁকির ঘটনাও। অটোর বডি লোহা লক্কড়ে গড়া, বেপরোয়া গতি, চালকরা ট্রাফিক আইন মানে না। যত্রতত্র চলে, সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। নীতিমালা ও নিবন্ধন চালু হয়নি। অথচ এতে বিনিয়োগ করেছে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও। এ বিপুল বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো নীতিমালা না থাকায় ঘটছে করফাঁকির ঘটনাও।

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে ব্যাটারিচালিত অটোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ লাখ। আমদানিকারক ও ডিলাররা জানিয়েছেন প্রতিবছরই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে এই ব্যবসা। তারা জানান, আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণও বেড়েছে এই ব্যবসায়।

স্থানীয় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইকো ব্যাটারিজ এর কর্ণধার মনির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে গ্রামাঞ্চলে চলাচলের অটোর জন্য ব্যাটারি উৎপাদন করা হয়। আমাদের পণ্যের চাহিদা প্রতি বছর ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান মাসে ৫ হাজার ব্যাটারি উৎপাদন করে। অটোর ব্যাটারি উৎপাদনে অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেছেন বলেও তিনি জানান।

আমদানির তথ্য চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অটোর বডি, মোটর কিংবা ব্যাটারি আমদানির পরিমাণ পৃথক করা হয় না। কারণ, একই এইচএস (হারমোনাইজড সিস্টেম) কোডে বড় গাড়ি, ফ্যান, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের মোটরসহ স্পেয়ার পার্টস বা খুচরা যন্ত্রাংশও আমদানি হয়। শুধু এনবিআর বা কাস্টমস নয়, এই অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কিংবা অন্য কোনো কর্র্তৃপক্ষের কাছে কোনো সঠিক তথ্য নেই।

জাতিসংঘের বৈশ্বিক বাণিজ্য তথ্য সংরক্ষণ সংস্থা কম্পট্রেডের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ চীন থেকে যে পরিমাণ মোটর ও যন্ত্রাংশ (ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স) আমদানি করে তার মোট মূল্য প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে স্বল্পমূল্য ক্যাটাগরির অটোর বডি, পাইপ, মোটর ও যন্ত্রাংশ রয়েছে।

স্তরে স্তরে ব্যাটারিচালিত অটোর ব্যবসা থেকে আয় ও মুনাফা হলেও পৃথক রাজস্ব নীতিমালা না থাকায় সরকার এই খাত থেকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট বা মূসক) ঠিকমতো পায় না। অনাদায়ী করের অভিযোগ পেয়ে কর আদায়ে এনবিআর কর্মকর্তারা বিভিন্ন মার্কেটে অবস্থিত ডিলারদের কাছে গেলে পুরো মার্কেটের দোকানমালিক সমিতির নেতারা চলে আসেন এবং একজোট হয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। সম্প্রতি রাজধানীর মুগদায় অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম মার্কেটে ডিলারদের সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের এমন ঘটনার পরবর্তী সময়ে দুপক্ষ সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছে। ডিলারদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূসক আদায় করা হচ্ছে।

এনবিআরের সেকেন্ড সেক্রেটারি (কাস্টমস পলিসি) মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার পণ্য আমদানিতে এইচএস কোড অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি (সিডি), সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি), রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি), মূসক, অ্যাডভান্সড ট্যাক্স (এটি) ও অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) আদায় করে থাকে। মূসকের হার ১৫ শতাংশ। তবে দ্বৈতকর (ডাবল ট্যাক্সেশন) এড়াতে সোর্স থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত মূসকের হার সমন্বয় করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১০০ টাকা মূল্যের মোটর ও যন্ত্রাংশ আমদানি করল কোনো আমদানিকারক। কাস্টমস ওই পণ্যের ওপর প্রয়োগযোগ্য সব করের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ মূসক আদায় করে। আমদানিকারক ওই পণ্য ১২০ টাকা মূল্য ধরে ১৫ টাকা মূসকসহ ১৩৫ টাকায় বিক্রি করে ডিলারের কাছে। ডিলার ১৩৫ টাকায় কেনা পণ্য ১৫০ টাকা মূল্য ধরে ১৫ শতাংশ মূসক যোগ করে তার বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে গ্রাহককে দেন। ডিলারের কাছ থেকে ওই পণ্য কিনে খুচরা বিক্রেতা মোট ক্রয়মূল্যের সঙ্গে মুনাফা যোগ করে মূসকসহ আদায় করেন গ্রাহকের কাছ থেকে। এনবিআর প্রতিটি স্তরে বাড়তি মূল্যের ওপর বিক্রেতার কাছ থেকে মূসক আদায় করে। ব্যবসায়ী ও এনবিআরের এই হিসেবে বিরোধ সৃষ্টি হয় প্রায়ই।

শুধু ডিলার বা বিক্রেতা পর্যায়ে নয়। করফাঁকির ঘটনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়েও। গত ৩০ আগস্ট এনবিআর জানায়, একটি চীনা ব্যাটারি উৎপাদক কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করে অত্যন্ত সুকৌশলে শত শত কোটি টাকার ভ্যাটফাঁকি দিয়ে চলেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ২১ মাসে ওই চীনা কোম্পানি সরকারকে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকার ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর বা মূসক) ফাঁকি দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত শতভাগ চীনা মালিকানাধীন ওই কোম্পানি ব্যাটারি প্রস্তুত করে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আসছে। দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ব্যাটারি বিক্রির রমরমা ব্যবসা করে আসছিল ওই কোম্পানি। গত আগস্ট মাসের ৩ তারিখে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত পরিদপ্তর (সিআইআইডি) জিওজো ইন্ডাস্ট্রি লি. নামে ওই কোম্পানির তারাবো বিশ্বরোডে অবস্থিত কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিক্রয়ের মূল (প্রকৃত) বাণিজ্যিক নথিপত্র জব্দ করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৭ সালের দিকে বৈদ্যুতিক মোটর সংযোজিত ইজিবাইক সড়কে নামলেও পরবর্তী সময়ের পরিক্রমায় এটি ব্যাটারিচালিত অটোতে রূপান্তরিত হয়। ১০০ থেকে হাজার, পর্যায়ক্রমে লাখ লাখ অটো এখন নিত্যদিন দেশের রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায়। গত ২০ বছরে এ সংখ্যা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। নগর-মহানগরগুলোর লাখ লাখ রিকশাও রূপান্তরিত হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোতে। রাজধানীসহ দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও চলছে এই অটো।

দেশে অটো উৎপাদনের পথিকৃত বিভাটেক। তুরাগ তীরে অবস্থিত এই কোম্পানির ব্যবস্থাপক আলামিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বছরে প্রায় ১ হাজার অটো তৈরি করি। আমাদের অটোর বডি উন্নত ও নিরাপদ। এখন এই সেক্টরে বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে গ্রামীণ মটরস, নেহা গ্রুপ এবং ওয়ালটন। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে এশিয়া কার এবং ই-ক্যামেল নামের কোম্পানিও অটো তৈরি করে। ওই এলাকায় আরও চার থেকে পাঁচটি কোম্পানিতে চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। বিভাটেক সিইও সাইদুর রহমান বলেন, ব্যবসাটিতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়েছে। এখন রেগুলেশন দরকার।

গুডহোপ মটরস নামে একটি কোম্পানির তৈরি অটো এখনো অনুমোদন পায়নি। কারণ, সরকারের নীতিমালা নেই। তাই ওই কোম্পানি শুরু থেকে অদ্যাবধি অটো তৈরির কাজ আউটসোর্স করে আসছে। এ তথ্য দেন খোদ কোম্পানিটির উদ্যোক্তা তরিকুল ইসলাম নিজেই। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই খাতে বিনিয়োগ করেছে। কেউ কমপ্লিট অটো আবার কেউবা ব্যাটারি বাজারে নিয়ে এসেছে। এই তালিকায় রয়েছে আল মদিনা, হামকো, আকিজ, রানার, মেট্রোসেম, ডাইনামিক, হাইটেক এবং ইফাদের মতো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে স্বল্প দামে বিক্রির জন্য ব্যাপকহারে অটো তৈরি করে টঙ্গীর চেরাগ আলীতে অবস্থিত আল মদিনা। ঢাকা সিটির পূর্ব দিকে স্টাফ কোয়ার্টার রোডে গ্রীন মডেল টাউনের সামনে অবস্থিত অন্য বৃহৎ অটো তৈরির কারখানা সাইনবোর্ডহীন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। ঢাকার বাইরে যশোরে ও কুমিল্লায় মনির ইঞ্জিনিয়ারিং দীর্ঘদিন ধরে অটো তৈরি করে বিক্রি করছে।

তরিকুল ইসলাম বলেন, ইফাদ, রানার, আকিজ, হামকো, মেট্রোসেম, ডাইনামিক, হাইটেক ছাড়াও এখানে সেখানে শত শত ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজে অটো তৈরি হচ্ছে। নীতিমালা নেই, তাই এই ব্যবসাকে বৈধ বলার সুযোগ নেই। ফলে করফাঁকির ঘটনাও ঘটছে।

তিনি বলেন, ব্যাটারির মধ্যে রয়েছে লিথিয়াম, ড্রাইসেল ও লিড অ্যাসিড। ব্যাটারি উৎপাদনে এখন বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ; তবে অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। মোটর ও যন্ত্রাংশের পুরোটাই আমদানি নির্ভর। তবে, শিট, ফোম, কাঠ, রেক্সিন যেহেতু দেশেই পাওয়া যায় তাই বডি তৈরিতে পাইপ ছাড়া ৯৫ শতাংশই দেশীয় উদ্যোক্তারা উৎপাদন করে। তিনি বলেন, উপাদানের সহজলভ্যতার কারণে যত্রতত্র অটো তৈরি হয়। একটি অটো তৈরির পর বিক্রি করতে পারলে বেশ লাভও হয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো সরকারই সুষ্ঠু, শোভন ও নিরাপদ গণপরিবহন দিতে পারেনি। এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। অল্প কিছু মানুষ নিজস্ব পরিবহন যেমন প্রাইভেট কার ও মোটরবাইক ব্যবহার করার সক্ষমতা রাখে। এদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১০-১২ শতাংশ। এই যে অবশিষ্ট বিপুলসংখ্যক নাগরিক পরিবহন ব্যবস্থায় ভাঙাচুরা, অনিরাপদ বাস এবং অন্য পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। আর এখানেই চাহিদা পূরণ করছে ব্যাটারিচালিত অটো। এখানে রাষ্ট্রের আরও একটি ব্যর্থতা সামনে আসে; তা হলো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারা। দেশীয় শ্রমবাজারের এই দুর্বলতায় একজন শিক্ষিত তরুণ বা কর্মক্ষম শ্রমিক অন্য কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান না পেয়ে অটো চালানোকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নেন। এ দুই ব্যর্থতায় অটোর ব্যাপকতা সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা তো টাকা লগ্নি করে মুনাফার জন্য। তারা এ সুযোগটিই নিয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত