শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির সরকার জরুরি বৈঠক করেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পাশাপাশি কিছু স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে প্যারিস অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিভিন্ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে শত শত বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, একপর্যায়ে ৩৪০টির মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছিল এবং ১৬০টির বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৪০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পুরোনো ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব এবং গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে অসহনীয় পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।
প্যারিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপশহরসহ ইল দ্য ফ্রন্স অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও আন্দোলনের প্রভাব দেখা গেছে। সেন্ট-দেনি এলাকায় শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কয়েকটি এলাকায় আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি বা বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে।
দেশটির বিভিন্ন শহরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মার্সেইয়ের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দিকে পেট্রল ছিটকে পড়ার ঘটনা ঘটে। একই শহরের আরেকটি স্কুলে আগুন নেভাতে যাওয়া দমকলকর্মীদের ঘিরে হামলার ঘটনা এবং পরে দমকলের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নঁতে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথেও আগুনের ঘটনা ঘটে। স্ট্রাসবুর্গে বিক্ষোভের কারণে ট্রাম চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
আন্দোলন উচ্চবিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও পৌঁছেছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্যারিস, মার্সেই, স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ঁ ও নঁতেরসহ প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশপথ অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে সংকট বৈঠক করেছেন। তিনি মন্ত্রীদের কয়েকটি নির্ধারিত সফর বাতিল বা স্থগিত করে চলমান পরিস্থিতিতে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এদিকে আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখা দিয়েছে। সরকারি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংকট বৈঠকে আন্দোলনের পেছনে বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ রাখার পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় কয়েকশ মানুষ আটক হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পুলিশ ও অন্যান্য ব্যক্তির আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার কয়েকটি ঘটনায় পুলিশের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণমূলক অস্ত্রের ভূমিকা নিয়ে ফ্রান্সের পুলিশ পরিদর্শন সংস্থা IGPN তদন্ত শুরু করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের দাবি ও উদ্বেগ শুনতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তবে স্কুল ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ফ্রান্সে আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলনের পরিধি কতটা বাড়ে এবং সরকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অবকাঠামোগত দাবির বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই নজরে রয়েছে।