বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি তো বটেই, ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ দেখতে যদি এমন পাঁচটি স্টেডিয়ামও পাশাপাশি থাকত, তবে তার প্রতিটিতেও তিল ধারণের ঠাঁই থাকত না! আলবিসেলেস্তাদের জার্সিতে মেসির বিদায়বেলার এই নজিরবিহীন উন্মাদনা নিয়ে ঠিক এভাবেই নিজের বিস্ময় আর মুগ্ধতা লুকাতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনি।
এই মনুমেন্তালেই আজ বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ৭-০ গোলের এক গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। তবে এই বিশাল জয়ের আনন্দ ছাপিয়েও স্টেডিয়ামজুড়ে এখন একটাই নাম আর গভীর দীর্ঘশ্বাস, লিওনেল মেসি। দিনকয়েক পরেই এই মাঠেই আলবিসেলেস্তাদের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন ফুটবলের এই মহাতারকা।
ম্যাচ শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনি যেমন দলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ও প্রতিপক্ষকে নিয়ে কথা বলেছেন, তেমনি খোলামেলা আলোচনা করেছেন মেসির বিদায়, নিজের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের দর্শন নিয়ে।
আগামী বুধবার বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানতে চলা মেসিকে নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন স্কালোনি। সংবাদ সম্মেলনে মেসির বিদায় ও তার অমর অবদান সম্পর্কে আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, ‘যদি পাঁচটি মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম থাকত, তবে সেগুলোর প্রতিটিতেই দর্শক উপচে পড়ত। আমি সব জায়গা থেকেই বার্তা পেয়েছি। আমার মনে হয় সবকিছুই বলা হয়ে গেছে, এখন কেবল উপভোগ করার সময়। যখন সে থাকবে না, তখন সেই নস্টালজিয়া কাজ করবে যা নিয়ে আমরা সবসময় কথা বলি।’
মেসির কাজের ধরন এবং সতীর্থদের ওপর তার প্রভাব নিয়ে স্কালোনি আরও বলেন, ‘তার উত্তরাধিকার হলো সবসময় উপস্থিত থাকার অদম্য ইচ্ছা। তিনি সবসময় সবার আগে আসতেন এবং সবার শেষে যেতেন। যেভাবে তিনি নিজের যত্ন নেন, প্রতিটি ম্যাচের প্রস্তুতি নেন, এগুলো এমন বিষয় যা অন্যরা হয়তো দেখতে পায় না, কিন্তু সতীর্থরা ঠিকই দেখে। এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না। তিনি পেছনে এমন কিছু রেখে যাচ্ছেন যা অপূরণীয়।’
ম্যাচের পারফরম্যান্স ও বুরকিনা ফাসোর প্রতি সম্মান জানিয়ে স্কালোনি
খেলার ফল একপেশে হলেও দূর থেকে দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তি মাথায় নিয়ে আসা সফরকারী বুরকিনা ফাসোর লড়াইয়ের মানসিকতাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েছেন কোচ। দলের সার্বিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে স্কালোনি বলেন, ‘প্রথমার্ধটা ভালো ছিল। আমরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই ম্যাচটি খেলেছি। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে, তরুণদের যাদের কেউ কেউ অভিষেকও করেছে, সুযোগ দিয়ে আমরা তাদের মানিয়ে নেওয়ার সময় দিয়েছি। সামগ্রিকভাবে আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করেছি।’
প্রতিপক্ষের লড়াইয়ের প্রশংসা করে স্কালোনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা বুরকিনা ফাসো এবং যারা এসেছিলেন তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা ফুটবলের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। আমরা ম্যাচটিকে একটি ফাইনালের মতো খেলার চেষ্টা করেছি, যাতে তাদের যথাযথ সম্মান জানানো যায়। তারা যে পরিমাণ ধকল সয়ে এত দূর এসে ম্যাচ খেলেছেন, তা মোটেও সহজ ছিল না।’
ব্যক্তিগত জীবন ও কোচের জীবনদর্শন
কোচিং ক্যারিয়ারের প্রচণ্ড চাপ ও দায়িত্ব পালনের মাঝেও নিজের ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার ওপর বরাবরই জোর দিয়ে এসেছেন লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি কোচ কার্লোস বিলার্দোর ফুটবলকে সর্বস্ব অর্পণ করার দর্শন বা 'বেঁচে থাকার কথা ভুলে যাওয়ার' তত্ত্বকে নিজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে নেন তিনি। স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনোভাবেই ফুটবলের স্রোতে ভেসে নিজের জীবনকে হারিয়ে ফেলতে চান না; বরং মানুষ যেভাবে তাকে চেনে, সেই স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিজের সত্তা টিকিয়ে রাখতে চান।
এছাড়া প্রয়াত কোচ আলেহান্দ্রো সাবেলার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং নিজের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আলেহান্দ্রোর স্ত্রীর সাথে আমার একটি কথোপকথন আমাকে খুব সাহায্য করেছিল; তিনি আমাকে বলেছিলেন যে আলেজান্দ্রোর জীবনকে আরও বেশি উপভোগ করা দরকার ছিল। এগুলো এমন কিছু বিষয় যা আমি পথ চলতে চলতে শিখেছি। এই অবস্থান অনেক বড় দায়িত্ব বহন করে। সবাই জানে আমি সাইকেল চালাই, বাচ্চাদের দেখতে যাই। আমি নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করি।’
লাউতারো-আলভারেজ জুটি নিয়ে ভাবনা
নিজের চুক্তির নবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রাখলেও দলের কৌশল এবং তরুণ ফরোয়ার্ডদের নিয়ে নিজের পরিকল্পনা পরিষ্কার করেছেন কোচ। দল পরিচালনা ও আক্রমণভাগ নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও কোনো খবর নেই। যখন কিছু থাকবে, সেটা ভালো হোক বা খারাপ হোক, আমরা তা ঘোষণা করব।’
আর সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে আলভারেজ ও লাউতারোর জুটি নিয়ে স্কালোনি যোগ করেন, ‘আমরা হুলিয়ান এবং লাউতারোকে একসাথে খেলানোর সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি, কারণ তারা একে অপরকে আগে থেকেই চেনে এবং এটি বেশ কঠিন ও গোছানো একটি আইডিয়া। তারা দুজন জেনুইন স্ট্রাইকার, এবং আমরা চাই তারা একে অপরকে বুঝে একসাথে কাজ করুক। সে কারণেই আমরা বারবার এটি নিয়ে কথা বলছি; এটি দলের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে।’
যাই ঘটুক, রোনালদোই পর্তুগালের ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক’