যাই ঘটুক, রোনালদোই পর্তুগালের ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক’

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১ পিএম

ভৌগোলিক নামের চেয়ে বিশ্ববাসীর কাছে দেশটি যেন অনেক বেশি পরিচিত ‘রোনালদোর পর্তুগাল’ হিসেবে। কিন্তু যে নামটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে অমর করে রেখেছে, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে কোচের দ্বন্দ্ব এবং ক্যাম্প ত্যাগের আকস্মিক ঘটনায় এখন লণ্ডভণ্ড পর্তুগিজ শিবির।

চারদিকে যখন নানা গুঞ্জন আর সমালোচনার ঝড়, তখন এই মহাগুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের ভেতরে ঐক্যের সুর গেয়ে ব্রুনো ফার্নান্দেক স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বিতর্ক যাই হোক না কেন, পর্তুগিজদের হৃদয়ে এবং বিশ্ব ফুটবলে রোনালদোর সিংহাসন চিরন্তন। 

পর্তুগালের পোর্তোয় অবস্থিত স্তাদিও দো দ্রাগাওয়ে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচপূর্ব এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে দলের পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার ও পর্তুগিজ তারকা ব্রুনো। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ডের মালিক এবং ইউরো ২০১৬ ও দুইবার নেশনস লিগ জয়ী এই মহাতারকার অবদান স্মরণ করে সংবাদ সম্মেলনে ব্রুনো বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানোকে নিয়ে আমি কথা বলেছি, এবং তাকে যা বলেছি সেটাই এখানে বারবার বলছি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাই ঘটুক না কেন, রোনালদো কখনোই আমাদের জাতীয় দল, আমাদের ফুটবল এবং দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হওয়া থেকে বিরত হবেন না, পর্তুগালে এবং পুরো বিশ্বে তিনি যা করেছেন তার জন্য।’ 

দলের ভেতরে চলা নানা গুঞ্জন ও বিতর্ক প্রসঙ্গে সতীর্থদের ভূমিকা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ব্রুনো আরও বলেন, ‘দলের সঙ্গীদের সাথে আলাদা করে কথা বলার প্রয়োজন নেই; আমরা সবাই জানি কীভাবে নিজেদের পরিস্থিতি সামলাতে হয়। এখানে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যার সাথে খেলোয়াড়দের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমি মনে করি, আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মাঠে নেমে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল উপহার দেওয়া। ড্রেসিংরুমে আমরা অনেক সময় আড্ডা দিয়ে বা তাস খেলে সময় কাটাই, আমরা মূলত এই সব বিতর্কের বাইরেই আছি।’ 

কোচের একাদশ নির্বাচন ও স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তারকা মিডফিল্ডার জানান, ‘কে মাঠে নামবে আর কে নামবে না, সেটা সম্পূর্ণ কোচের সিদ্ধান্ত। সৌভাগ্যবশত, এই দায়িত্বটা আমার নয়। তবে এটি দলের দুর্দান্ত গভীরতারই লক্ষণ, যেখানে যেকোনো পজিশনে খেলার মতো এবং একসাথে মাঠে অবদান রাখার মতো মানসম্মত খেলোয়াড় রয়েছে। জাতীয় দলে থাকাটা অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার, আর কেউ বেশি খেলুক বা কম খেলুক, সেটাকে কখনোই নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়। আমরা সবাই দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই এবং কোচকে ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে কঠিন এক ভাবনার মধ্যে ফেলতে চাই।’ 

সব মিলিয়ে সবাইকে দলের ঐক্য ধরে রাখার তাগিদ দিয়েছেন ব্রুনো এবং বিষয়গুলো বন্ধ দরজার আড়ালেই সমাধান করার দাবিও জানিয়েছেন। ‘তিনি (রোনালদো) কেবল সর্বকালের সেরাদের মধ্যেই নন, সমস্ত পর্তুগিজদের হৃদয়েও একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের এই বিভাজন তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। জাতীয় দলে কোনো বিভাজন নেই; এটি একটি দল এবং বাইরের যেকোনো কোলাহল সত্ত্বেও এভাবেই থাকবে। যেকোনো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো বন্ধ দরজার আড়ালেই সমাধান করা উচিত। আমার অনুরোধ দেশ যেন বিভক্ত না হয়, কোনো পক্ষ বেছে না নেয় এবং সব পক্ষকে সম্মান জানায়।’ 

এর আগে সবশেষ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই পর্তুগিজ ডাগআউটে বড় পরিবর্তন আসে। রবার্তো মার্তিনেজের স্থলাভিষিক্ত হন আল-নাস্‌রে রোনালদোর সাবেক কোচ হোর্হে জেসুস। বর্তমান ক্যাম্পেইনটি ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় দিয়ে শুরু করলেও (যেখানে রোনালদো ৬৭ মিনিট খেলেছিলেন), নরওয়ের বিপক্ষে তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার পর থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এরপর ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো না থাকলেও ব্রুনোর নেতৃত্বে ৪-২ গোলের দারুণ জয় তুলে নেয় পর্তুগাল। বর্তমানে ৩ ম্যাচে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এ৪’-এর শীর্ষেই রয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

বিমানবন্দরের শেষ মুহূর্তের নাটক ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ

রোনালদোর এই হঠাৎ দলত্যাগের সিদ্ধান্ত সহজভাবে নেয়নি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মার্কা’র সাংবাদিক নুনো লুজ জানিয়েছেন, রোনালদোকে ডেনমার্কের ক্যাম্প ছাড়ার হাত থেকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্তের এক নাটকীয় চেষ্টা চালিয়েছিলেন কোচ জেসুস এবং ফেডারেশন সভাপতি পেদ্রো প্রয়েঙ্কা। মধ্যরাতের দিকে কোপেনহেগেনের ক্যাম্প ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেওয়া রোনালদোর পেছনে ছুটে গিয়ে তাকে বোঝানোর শেষ চেষ্টা করেন তারা। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে রোনালদো কারোর কথায় কান না দিয়ে বিমানে চড়ে বসেন।

ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে কোচ জেসুসও এই মহাতারকার দলত্যাগ ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন। আল-নাস্‌রের সাবেক এই কোচ বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানো পর্তুগালের একটি প্রতীক। তবে এই মুহূর্তে আমি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছি দলের ওপর এবং আমাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ নরওয়েকে নিয়ে, যারা ইউরোপের সেরা পাঁচটি দলের একটি। এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।’ 

নরওয়ের বিপক্ষে আজকের ম্যাচের পর আগামী নভেম্বর মাসে ডেনমার্ক ও ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচ খেলে গ্রুপ পর্বের লড়াই শেষ করবে পর্তুগাল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত