মানসম্মত আবাসন প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার। অথচ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু তীব্র আবাসন সংকটে জর্জরিত। এই সংকট কেবল বাসস্থানের অপ্রতুলতাই নির্দেশ করে না, বরং ঢাকা নগরীর টেকসই নগরায়ণের ওপর একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে ধরেছে।
ঢাকা মহানগরীতে সর্বস্তরের মানুষের বসবাস থাকলেও আবাসন বাজার মূলত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক। বেসরকারি রিয়েল এস্টেট ও ল্যান্ড ডেভেলপাররা বিগত কয়েক দশকে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আবাসন উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে অল্প কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হলেও শহরের চাহিদার তুলনায় তা ছিল খুবই অপ্রতুল।
ঢাকা শহরে অভিবাসনের অনিয়ন্ত্রিত চাপ মোকাবিলায় আবাসনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে শহরের নদী, জলাশয়, প্লাবনভূমি ও কৃষিজমি অকাতরে ভরাট করা হয়েছে।
আবার আবাসনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আয়শ্রেণির নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় তীব্র বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত এলাকাগুলোতে কিছুটা খোলা জায়গা, পার্ক, খেলার মাঠ, প্রশস্ত রাস্তা ও উদ্যান থাকলেও স্বল্প আয়ের কিংবা শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে খেলার মাঠ, প্রাথমিক বিদ্যালয় বা পার্কের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল।
ঢাকার আবাসন সংকট নিরসনে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দরকার ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনঘনত্ব পরিকল্পনা এবং শহরের উন্নয়নের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। ২০২২ সালে প্রণীত ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) এ বিষয়গুলো নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছিল। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ড্যাপ অনুমোদনের তিন বছরের মাথায় দুই বার এই পরিকল্পনা বদলে দিয়ে বিভিন্ন এলাকার ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ (ফার), আবাসন ইউনিট ও জনঘনত্ব বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে, ড্যাপে প্রস্তাবিত সাশ্রয়ী আবাসন, এলাকাভিত্তিক পার্ক-খেলার মাঠ, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাদি বাস্তবায়নের প্রস্তাবনাগুলো এখন পর্যন্ত উপেক্ষিত থেকে গেছে।
ঢাকার আবাসন সংকট নিরসন ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে নিম্নের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি :
১. সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে ১০-১৫% জমি বা ডুয়েলিং ইউনিট বাধ্যবাধকতা : যেকোনো শহরের মূল চালিকাশক্তি হলো তার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। অথচ ঢাকা মেগাসিটির সরকারি ও বেসরকারি প্রায় সব আবাসন পরিকল্পনাই উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক, যেখানে প্রান্তিক মানুষের আবাসন চাহিদা চরমভাবে উপেক্ষিত। এই বৈষম্য নিরসনে রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ যেকোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জমি অথবা নির্মিত ফ্ল্যাট/ডুয়েলিং ইউনিট নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভূমির জোগান নিশ্চিত করতে হবে।
২. ঢাকার জনঘনত্ব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন : নগর পরিকল্পনার অন্যতম কঠিন কাজ শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং তা কঠোরভাবে বহাল রাখা। ঢাকার পরিবেশ ও জনঘনত্বের ভারসাম্য রক্ষায় বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ‘ডেনসিটি জোনিং’ (জনঘনত্ব পরিকল্পনা) কোনো প্রকার প্রভাবশালীদের স্বার্থে পরিবর্তন না করে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ঘনঘন ড্যাপ সংশোধন বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের নদী, খাল, জলাশয়, প্লাবনভূমি ও কৃষিজমি ভরাট সম্পূর্ণ বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখতে হবে; কারণ প্রাকৃতিক জলাশয় ও জলাভূমি নষ্ট করে কোনো নগরায়ণই টেকসই হতে পারে না।
৩. বস্তিসহ অনানুষ্ঠানিক আবাসনের মানোন্নয়ন ও পিওপিপি মডেল : শহরের বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোকে কোনো স্থায়ী বিকল্প না দিয়ে রাতারাতি উচ্ছেদ করাটা টেকসই সমাধান নয়। এর বদলে বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকার মানোন্নয়নের (অন সাইট আপগ্রেডেশন) মাধ্যমে সেখানেই আলো-বাতাস, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পাবলিক-প্রাইভেট-কমিউনিটি পার্টনারশিপ মডেল অনুসরণে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য একটি বাজারভিত্তিক টেকসই আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এই মডেলে সরকার জমি ও নীতিগত সুবিধা দেবে, আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগের মাধ্যমে সর্বসাধারণের সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ করবে।
৪. সমবণ্টনমূলক নাগরিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ : ঢাকাকেন্দ্রিক মাত্রাতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এই শহরের ওপর অনাবশ্যক চাপের মূল কারণ। একদিকে যেমন ঢাকার অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করতে প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় পার্ক, খেলার মাঠ, মানসম্মত স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো নাগরিক সুবিধা সমবণ্টন করতে হবে; অন্যদিকে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকার বাইরের আঞ্চলিক শহরগুলোকে নতুন ‘গ্রোথ সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়িত হলে ঢাকামুখী অতিরিক্ত মানুষের চাপ কমবে এবং সমগ্র দেশে একটি সুষম ও টেকসই স্থানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনার আধুনিকায়ন ঘটিয়ে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নগরের অনানুষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উভয় অর্থনৈতিক খাতকে টেকসই করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবদানকে স্বীকার করে তাদের বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পরিকল্পনার মূল দর্শন অনুযায়ী স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সামাজিক ও সাশ্রয়ী আবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দরকার ঢাকার স্থানিক ও জনসংখ্যাগত বৃদ্ধির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে একদিকে যেমন ঢাকার জনঘনত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে, অন্যদিকে একটি বাসযোগ্য, সমতাভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বিশ্ব বসতি দিবসে রাষ্ট্রকে সেই পথেই হাঁটার অঙ্গীকার করতে হবে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান
অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাবি