বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, চ্যালেঞ্জ অনিবার্য হলেও সঠিক পরিকল্পনা, নীতি ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এসব সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশনের তৃতীয় দিনে ‘লিডার ইন অ্যান এইজ অব আনসার্টেইনিটি’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রযুক্তি, জলবায়ু, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও ভূরাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তবে এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংকটটি বাংলাদেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও এর মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা সম্ভব। মিয়ানমারেই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রযুক্তির কারণে কত কর্মসংস্থান হারাবে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল-নদী খনন ও পুনঃখনন এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে তিনি বলেন, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ এবং নাগরিকদের জন্য ‘হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব সুবিধাকে একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাঁদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে জানান তিনি।
আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায় সরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও সমুদ্র নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। এ জন্য তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, সংকট থাকবেই; তবে প্রতিটি সংকটকে সমস্যা সমাধান ও জনগণের ক্ষমতায়নের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রে রেখে দৃঢ় মূল্যবোধ, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সম্ভব।
আঞ্চলিক সংহতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।