বৈশ্বিক বাজারে কমপ্লায়েন্স (নিয়মতান্ত্রিকতা) পরিপালনের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে, একটি উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপে বক্তারা ট্যানারি শিল্প উপজাতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে সম্প্রসারণ করতে একটি ব্যাপকভিত্তিক ‘জাতীয় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি’ প্রণয়নের তীব্র দাবি জানিয়েছেন।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ : চামড়া শিল্পজাত কঠিন বর্জ্য (টিএসডব্লিউ) উপজাত উদ্যোক্তা মডেল’ শীর্ষক এই নীতি সংলাপ গতকাল সোমবার রাজধানীর এক হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি কর্মকার বলেন, চামড়া শিল্পজাত কঠিন বর্জ্যকে কেবল পরিবেশ বা নদীদূষণের সমস্যা হিসেবে না দেখে, সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির একটি মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নীতি-সহজীকরণ, উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সম্পদ দক্ষতা, পণ্য বহুমুখীকরণ, কমপ্লায়েন্স এবং মূল্য সংযোজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চামড়া শিল্পজাত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাজারের সুযোগ, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও গবেষণার ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি, গবেষণার সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত নীতিগত পদক্ষেপ নিতে শিল্প মন্ত্রণালয় বিল্ড ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলে তিনি আশ্বাস দেন। বাংলাদেশের একটি প্রতিযোগিতামূলক, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব চামড়া খাত গড়ে তুলতে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা সংস্থা, শিল্প অ্যাসোসিয়েশন এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে চামড়া শিল্পজাত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উপজাত প্রকল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করতে চাইলেও কাঁচামালের তীব্র ঘাটতির মুখে পড়ছেন। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে সরকারি মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও টেকসই সহযোগিতা গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম জানান, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বার্ষিক প্রায় ৮৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তার উপস্থাপনায় উঠে আসে যে, এই বর্জ্যরে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হলো ক্রোমিয়াম-মুক্ত বিমহাউজ ট্রিমিংস ও ফ্লেশিং, যার জেলাটিন, কোলাজেন, প্রোটিন মিল ও ট্যালোর মতো উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ত্রুটিপূর্ণ নীতি কাঠামো, অস্পষ্ট বর্জ্য কোড শ্রেণিবিন্যাস এবং উৎসস্তরে বর্জ্য পৃথকীকরণের প্রোটোকলের অভাবে এই মূল্যবান শিল্প উপকরণগুলোর বেশিরভাগই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে অথবা যত্রতত্র ডাম্প করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার রূপান্তরের জন্য বর্জ্যকে বিপজ্জনক আবর্জনা হিসেবে না দেখে সেকেন্ডারি শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। তার তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনায় বাণিজ্যিক বায়োরিফাইনারি থেকে শুরু করে এসএমই পর্যায়ের ট্যালো নিষ্কাশন ইউনিট পর্যন্ত কার্যকর ব্যবসায়িক মডেলগুলো তুলে ধরা হয়, যা দেশীয় বাজারে বিপুল মূল্য সংযোজন করতে পারে এবং জেলাটিন, আঠা, জুতার সোলে ও পোলট্রি ফিড অ্যাডিটিভস আমদানির পেছনে বার্ষিক প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে পারে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, ইনডোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন, বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আইনী ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, ডিটিআইডব্লিউটিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম, বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন খান প্রমুখ।