বিস্ফোরক রোনালদো, 'কোচ কথা রাখেননি'

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ এএম

পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে আকস্মিক চলে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কোচ জর্জ জেসুসের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সরাসরি অভিযোগ তুলে এক খোলা চিঠিতে ঘটনার বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। দীর্ঘ এই বিবৃতিতে সতীর্থ ও পর্তুগালের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মাথা পেতে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি ১৭৪০ শব্দের বিবৃতিতে।

উয়েফা নেশনস লিগে ওয়েলসের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে খেলার পর নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ম্যাচ না খেলে হঠাৎ ক্যাম্প ত্যাগ করেন রোনালদো। মঙ্গলবার পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম 'এ বোলা'তে প্রকাশিত তাঁর এই বিস্ফোরক বক্তব্যের পর পুরো ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

বিবৃতিতে রোনালদো জানান, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন  সভাপতি পেদ্রো প্রয়েঞ্চা তাকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ জানান এবং নতুন কোচ হোর্হে জেসুসকে নিয়োগের বিষয়ে মতামত চান।

রোনালদোর মতে, পরে কোচ জেসুস তাঁকে জানান যে দলের জন্য সিআরসেভেনের উপস্থিতি অপরিহার্য। কোচের প্রস্তাব ছিল— রোনালদো প্রতিটি ম্যাচের প্রথম ও শেষ অংশে অংশ নেবেন এবং শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখতে সব অ্যাওয়ে ম্যাচে ভ্রমণ না করলেও চলবে। কিন্তু দলের নেতৃত্ব ও অধিনায়কের দায়িত্বের খাতিরে সেই বিশেষ সুবিধা নিতে অস্বীকৃতি জানান রোনালদো।

নরওয়ে ম্যাচের সেই বিশ্বাসভঙ্গ

আসল সমস্যার সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর নরওয়ে ম্যাচের দিনে। রোনালদো জানান, সেই ম্যাচের দিন দুপুরে কোচ হঠাৎ তাকে ৩০ মিনিট খেলার জন্য তৈরি হতে বলেন। কোচের কথা অনুযায়ী ম্যাচের প্রথমার্ধের পর থেকে রোনালদো ওয়ার্ম-আপ (ওয়ার্ম আপ) শুরু করেন, কিন্তু পুরো ম্যাচেই তাকে মাঠে নামানো হয়নি।

রোনালদো স্বীকার করেন, "ম্যাচ শেষে হতাশায় দর্শকদের অভিবাদন না জানিয়ে আমি একাকী চলে আসি। এটা আমার ভুল ছিল এবং এর জন্য আমি পর্তুগিজ জনগণ ও ভক্তদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।"

ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর কোচ, রোনালদো এবং আল-নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমাও কৌতিনিওর উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হয়। সেখানে স্থির হয়—কোচ সংবাদ সম্মেলনে নিজের ভুলের কথা স্বীকার করবেন এবং জানাবেন যে এটি কেবল তার সিদ্ধান্ত ছিল, রোনালদো নিজে খেলার জন্য কোনো দাবি জানাননি।

কিন্তু পরে সংবাদ সম্মেলনে কোচ পূর্বনির্ধারিত সেই কথাগুলো বলেননি। রোনালদোর ভাষায়, "এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয়বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা। এরপর আর কথা না রাখার নিশ্চয়তা ছাড়াই আমি ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই।"

খোলা চিঠির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক:

  • অধিনায়কের অনুশোচনা ও সমতা: চিঠিতে রোনালদো স্বীকার করেছেন যে, তিনি শুধু একজন সাধারণ খেলোয়াড় নন, দলের অধিনায়ক। তাই অধিনায়কের দায়িত্ব ছেড়ে ক্যাম্প ত্যাগ করা বড় অপরাধ। ফুটবলে সবার জন্য নিয়ম সমান—এই নীতি মেনে তিনি ফেডারেশনের যেকোনো কঠোর শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি আছেন।
  • শাস্তি মাথা পেতে নেওয়ার ঘোষণা: নিয়ম ভেঙে দল ছাড়ায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সম্ভাব্য শাস্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমি কেবল একজন সাধারণ খেলোয়াড় নই, আমি দলের অধিনায়ক। তাই আমার দায়িত্ব আরও বেশি। ফেডারেশন যে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেবে, তা আমি মেনে নেব। কারণ ফুটবলের নিয়ম সবার জন্য সমান।"
  • অবসরের ইঙ্গিত নাকচ: আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞা কাটানোর পর শারীরিক ফিটনেস থাকলে দেশের হয়ে জয় পেতে তিনি আবার মাঠে নামতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে বিদায়ী ম্যাচের জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

জাতীয় দলে ‘বিশেষ মর্যাদা’ ও নিয়মকানুন

  • বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ক্যাম্পের আগে কোচ জেসুস তাঁকে দেশে রেখে শুধু হোম ম্যাচগুলোতে খেলানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন অধিনায়ক হিসেবে বিশেষ সুবিধা নেওয়া অন্য খেলোয়াড়দের সামনে ভুল বার্তা দেবে ভেবে তিনি শুরুতেই সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
  • স্মৃতিচারণ: চিঠিতে আবেগঘনভাবে রোনালদো তাঁর শৈশবের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কথা স্মরণ করে লেখেন, জীবনে তিনি বিনা মূল্যে বা দয়ায় কিছু পাননি। বিদায়ী ম্যাচের জন্য তাঁর কোনো বিশেষ করুণার প্রয়োজন নেই।
  • দেশের জন্য ত্যাগ: ২০০৫ সালে জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় যখন তিনি বাবার মৃত্যুসংবাদ পান, তখনও পরদিনই দেশের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ক্লাব ফুটবলের জন্য যা কখনোই করতেন না, দেশের জন্য তিনি সেই ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। তাই জাতীয় দলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা প্রশ্নাতীত।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন-এর অবস্থান

 এফপিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং শীঘ্রই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করবে। রোনালদোর বিস্ফোরক চিঠির পর পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রয়েঞ্চা কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন বলে জানা গেছে।

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত