বহুমুখী অপরাধে বিদেশিরা

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

মানব পাচার, সোনা চোরাচালান, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, মাদক কারবার ও পাচার, প্রতারণা ও অনলাইন জালিয়াতি, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, জাল মুদ্রা তৈরি, বিয়ের নামে প্রতারণা এবং অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনাসহ এদেশে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন বিদেশি নাগরিক। অপরাধে জড়িতদের অনেকে বাংলাদেশে ঢুকেই পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলেন, আবার অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে পাসপোর্ট ফেলে দেন অথবা পাসপোর্ট হারানোর কথা বলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর জিডির সুবাদে অবৈধভাবে থাকার সুযোগ নেন। গ্রেপ্তার বা মামলার আসামি হলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়েও অপরাধ কর্ম চালিয়ে যান। এসব কাজে তাদের সহযোগিতা করছে এ দেশের একশ্রেণির অপরাধী। বিভিন্ন সময়ে এসব অপরাধে গ্রেপ্তার ২১ দেশের ৪০৭ নাগরিক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারত ও মিয়ানমারের নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। তবে বড় অপরাধে অভিযুক্তদের মধ্যে চীন, নাইজেরিয়া, পেরু ও তানজানিয়ার নাগরিকই বেশি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ভিসার মেয়াদ পার হওয়া বিদেশিদের অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অভিযান চালিয়ে অপরাধ কর্মকা-ে জড়িত বিদেশিদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে বসবাসকারীদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবার একটা অংশ প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি কোনো নাগরিক এ দেশে প্রবেশের পর তার ওপর সর্বক্ষণিক নজর রাখা জরুরি। এমনকি তিনি যে কাজের অনুমোদন নিয়ে এসেছেন, সেই কাজটি করছেন কি না তাও তদারকি করা প্রয়োজন। এই তদারকি যথযথভাবে না হওয়ায় বিদেশি নাগরিকরা অপরাধে জড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি নাগরিকদের কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি নাগরিক হলেও অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিদেশি নাগরিকরা যে কাজের অনুমতি নিয়ে আসছেন, সেটি করছেন কিনা, তা আরও তদারকি করা প্রয়োজন।

প্রতারণার নানা ধরন : গত ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে ভারতীয় নাগরিক রবিউলকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল জানিয়েছেন, ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তিনি পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভিসায় বাংলাদেশে যাতায়াত করেছেন। মূলত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আড়ালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও নিষিদ্ধ এলাকার ছবি, স্পর্শকাতর নথি এবং তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাচার করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কম দামে এয়ারলাইনসের টিকিট কিনে বেশি দামে বিক্রি করে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৮ সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়ার তিন নাগরিককে খুলনার হরিণটানার খালিশপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাদের সঙ্গে দেশীয় চক্র রয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন কেজি কুশসহ ভারতীয় নাগরিক হুসাইন আবদুল কাদের শেখকে (৪৮) গত ২২ আগস্ট গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থেকে বিভিন্ন দেশের ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, ওয়েবসাইট খুলে ও বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করতেন বলে অভিযোগ। তাদের সহায়তা করতেন লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহসিন। পরে তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

চীনাদের অপরাধের জাল : নানা উন্নয়ন প্রকল্প, বাণিজ্য ও পর্যটন ভিসায় দেশটির নাগরিকরা সহজেই বাংলাদেশে আসতে পারছেন। তবে তাদের একটি অংশ উত্তরায় ‘ঘাঁটি’ গেড়ে অনলাইন জুয়া ও নানা প্রতারণার পাশাপাশি বিয়ের প্রলোভনে পাচার, খুন ও ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধেও জড়াচ্ছেন।

ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে বিভিন্ন দেশের ৩২ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১৯ জনই চীনা। অন্তত ২০টি মামলার আসামি হিসেবে দেশটির আরও কয়েকজন নাগরিককে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

১৪ মে উত্তরা ও তুরাগে অভিযান চালিয়ে চীনের ছয় নাগরিক ও তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। চক্রটি ডিজিটাল গেটওয়ের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করে আসছিল। ২ আগস্ট ভাটারা থেকে অনলাইন জুয়া, প্রতারণা ও অবৈধ ভিওআইপি নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে চীনের তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছয় হাজারের বেশি সিমকার্ড, মোবাইল ফোন, ২০টি গেটওয়ে মেশিন উদ্ধার করা হয়। চক্রটি প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা পাচার করে আসছিল বলে জানিয়েছে ডিবি। ১৭ মার্চ তুরাগ এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালায় এসআরবি ও পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় বাংলাদেশি নাগরিক সুইটি আক্তার (২৯) এবং চীনের দুই নাগরিক জেন ফ্যান (৩৮) ও জিন সুচানকে (৩২)। ওই সময় বাসা থেকে জিম্মি অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এক তরুণীকে। তাকে পাচারের জন্য জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সুইটি আক্তার ও তার স্বামীর নেতৃত্বে চীনা চক্রটি বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণীদের বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে উত্তরায় এনে আটকে রাখে। এরপর ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের কথিত বিয়ের মাধ্যমে চীনের নাগরিকদের হাতে তুলে দিত। একজন বিয়ে করলেও জিম্মি রেখে একাধিক পুরুষ মিলে ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করত।

২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের একটি বাসা থেকে ওয়াং বো নামের চীনের এক নাগরিকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওয়াং বো নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ী ছিলেন।

পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, পূর্ব শত্রুতার জেরে চীনেরই দুই নাগরিক ফান পেং ও লিউ ফ্যানলং পর্যটকের ছদ্মবেশে চীন থেকে ঢাকায় এসে ওয়াং বোকে নির্মমভাবে হত্যা করে ফের গোপনে এ দেশ ছেড়ে চলে যান।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০ হাজার চীনা নাগরিক বসবাস করেন। তাদের মধ্যে যারা অপরাধে জড়িত, তাদের জাল শহর ছাপিয়ে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যেসব চীনা নাগরিক প্রতারণায় যুক্ত, তাদের কাছ থেকে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় বেশি। এ জন্য এক শ্রেণির বাড়ির মালিক এই ধরনের বিদেশিদের বাসা ভাড়া দিতে আগ্রহী হন এবং তাদের অবস্থানের বিষয়টি গোপন রাখেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময় বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছেন, অনেক বাড়িতে বিদেশি নাগরিকরা ভাড়া থাকলেও ভাড়ার চুক্তি হয় তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের নামে। এ জন্য ভাড়াটে তথ্য ফরমেও বিদেশিদের অবস্থানের কথা উল্লেখ থাকে না। এ ছাড়া বিদেশি হওয়ায় পুলিশও তাদের নিয়ে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করে না।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো বিদেশির অপরাধ কর্মকা-ের খবর পেলেই তাদের আইনের আওতায় আনা হয়। প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিদেশি হলেও কেউ অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকায় গ্রেপ্তার ৩২ : বহুমুখী অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে গত দুই বছরে বিভিন্ন দেশের গ্রেপ্তার ৩২ নাগরিকের মধ্যে ১৯ চীনা নাগরিক ছাড়াও নাইজেরিয়ান পাঁচজন রয়েছেন। এ ছাড়া ব্রাজিলের একজন, নেপালের এক, আইভরি কোস্টের দুই, সোমালিয়ার এক, ক্যামেরুনের এক, ঘানার এক এবং কংগ্রো প্রজাতন্ত্রেরও একজন রয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক বিদেশি বাংলাদেশে এসে দেশীয় অপরাধ চক্রের সঙ্গে মিলে নানা অপরাধ কর্মকা- ঘটাচ্ছে। এমন ঘটনায় জড়িত বিদেশি ও দেশীয় চক্রকে প্রায়ই আইনের আওতায় আনা হয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, পুলিশের সফটওয়্যারে সিটিজেন (নাগরিকের তথ্য) রয়েছে। বাড়িওয়ালারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার জন্য সব ভাড়াটিয়ার সঠিক তথ্য পুলিশকে সরবরাহ করা উচিত। লোভে পড়ে বিদেশিদের তথ্য গোপন রাখলে এক সময় নিজেদেরই হুমকির মুখে পড়তে হবে।

কারাগারে ৪০৭ বিদেশি : কারা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারগুলোতে ২১টি দেশের ৪০৭ বিদেশি বন্দি রয়েছেন। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৪০৭ বিদেশির মধ্যে কয়েদি ৪৪ জন, হাজতি ১৯১ জন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত ১৭২ জন। ভারতের বন্দি ২৩৮ নাগরিকের মধ্যে কয়েদি ছয়জন, হাজতি ৬৪ জন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত ১৬৮ জন রয়েছেন। মিয়ানমারের ১৩৩ জনের মধ্যে কয়েদি ৩৩ জন, হাজতি ৯৯ জন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত একজন। পাকিস্তানের কয়েদি দুই জন, মুক্তিপ্রাপ্ত একজন। চীনা হাজতি ১৩ জন, মুক্তিপ্রাপ্ত একজন। মালয়েশিয়ার একজন, মালাওয়ের দুজন, নাইজেরিয়ার ছয়জন, তানজানিয়ার দুজন, জর্জিয়ার একজন, পেরুর দুজন, বাহামার একজন, বেলারুশের একজন, গায়ানার একজন, কঙ্গোর একজন, ইথিওপিয়ার একজন এবং থাইল্যান্ডের একজন।

সাজা শেষে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ১৭২ বিদেশিকে বিভিন্ন জটিলতায় সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সাজা শেষেও অতিরিক্ত সাজা ভোগ করছেন তারা।

কারা অধিদপ্তরের এআইজি প্রিজন (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো বিদেশি বন্দির সাজার মেয়াদ শেষ হলে তাকে নিয়ে যেতে তার দেশের দূতাবাসকে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস ওই বন্দির ভেরিফিকেশন করেন। পরিচয় নিশ্চিত হতে উল্লেখিত ঠিকানায় বন্দির পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নেন। কিন্তু বন্দির কোনো স্বজনকে পাওয়া না গেলে দূতাবাস থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। ফলে তাদের ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত