'দিল্লি বিক্ষোভ পিছু হটবে না': প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিলের ডাক

'এতদিন মোদীজি ভোট চুরি করে জিততেন, এখন হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। যেখানে আটকাবে, সেখানেই বসে পড়ুন, সেই জায়গাকেই যন্তর মন্তর বানান।'

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ এএম

দিল্লি পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়, মেট্রো বন্ধ, ট্রেন বাতিল ও ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও পিছু হটছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে ডাকা বিক্ষোভে প্রায় তিন হাজার মানুষকে আটক করা হলেও রবিবার (১১ অক্টোবর) ফের রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের সাফ কথা, দাবি না মানা পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল চলবে। খবর আনন্দবাজার, এনডিটিভি ও দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন-এর। 

শনিবার কী ঘটেছিল? 

ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়ম ও ১৩.৩ কোটি ভোটার বাদ পড়ার অভিযোগে সিজেপি শনিবার যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দেয়। পুলিশ আগে থেকেই অনুমতি দেয়নি। ভোর থেকেই দিল্লিকে কার্যত অভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়।

যন্তর মন্তরগামী সব রাস্তায় সাত স্তরের ব্যারিকেড, ঝালাই করা প্রাচীর, স্টিলের কাঁটা, বডিক্যাম ও ড্রোন বসানো হয়। ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের গেট ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ, ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল এবং যন্তর মন্তরের চারপাশে ৪ কিলোমিটার এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোতায়েন করা হয় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য। তৈরি করা হয় একাধিক অস্থায়ী আটক শিবির।

সকাল থেকেই শুরু হয় ধরপাকড়। কনট প্লেস, দিল্লি হাট, বিভিন্ন হোটেল ও বাড়ি থেকে বিক্ষোভকারীদের তুলে নেওয়া হয়। আইসার সভাপতি নেহা বোরার নেতৃত্বে দিল্লি হাটের কাছে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ধরনার চেষ্টা করলে লাঠি হাতে ভ্যানে তোলা হয়।

বিমান থেকে আটক শীর্ষ নেতৃত্ব:

সকাল ১০টা ১৯ মিনিটে মুম্বাই থেকে আসা বিমান দিল্লিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিমানের ভেতরে ঢুকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। পরে তাদের তিনটি আলাদা জায়গায় নেওয়া হয়। আটকের আগে রেকর্ড করা ভিডিওতে দীপকে বলেন, জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীও এমন করেননি। আটক হলে অজিঙ্ক শিন্দে নেতৃত্ব দেবেন।

এদিন অভিজিৎ দীপকের ঠাকুরমা মহারাষ্ট্রে মারা যান, তখনো তিনি হেফাজতে। পুলিশ জানায়, তাকে শেষকৃত্যে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।

গুরুগ্রাম থেকে আটক করা হয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকেও। রাত পর্যন্ত ৩ হাজার আটক মুক্ত হলেও দীপকে, ধ্রুব রাঠীসহ ৪ জন হেফাজতেই ছিলেন।

চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ বিরোধীরা আটক:

এদিন আটক তালিকায় ছিলেন চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী — আপের অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সাবেক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাম নেতা পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকার।

কেজরিওয়ালের লোধি এস্টেটের বাসভবন সকাল থেকে ঘিরে রাখা হয়। যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাকে পা ও বুক ধরে তুলে বাসে তোলে।

আটকের আগে তিনি দিল্লি চলো ডাক দিয়ে বলেন, 'এতদিন মোদীজি ভোট চুরি করে জিততেন, এখন হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। যেখানে আটকাবে, সেখানেই বসে পড়ুন, সেই জায়গাকেই যন্তর মন্তর বানান। সারা দেশকে যন্তর মন্তর বানাও। পরে মুক্তি পেয়ে বলেন, মোদীজিকে বলতে চাই, জেলে জায়গা কম পড়বে।'

সাবেক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাউথ অ্যাভিনিউতে বাড়ি থেকে বের হতে না দেওয়ায় তিনি বাসস্ট্যান্ডে বসে বিক্ষোভ শুরু করেন। মুখে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে প্রতিবাদ করেন।

পরে পাঁচ সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেনসহ তাকে ভ্যানে তোলা হয়। বাসের ভেতর থেকে তিনি বলেন, এটা জরুরি অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে, সুপার ইমার্জেন্সি হয়ে গেছে। ইন্ডিয়া জোট লড়াই চালিয়ে যাবে।

সাবেক কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন এক্সে লেখেন, বিরোধীদের ভয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘোরানো লজ্জাজনক।

আরও আটক হন বাম নেতা এম এ বেবি, বৃন্দা কারাত, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, কর্মী যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণ, আপের সঞ্জয় সিং, সৌরভ ভরদ্বাজ, গোপাল রাই এবং তৃণমূলের সাকেত গোখলে। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকেও আটক করা হয়।

‘আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন’, রাহুলের চ্যালেঞ্জ: 

চেন্নাইতে ছাত্রদের অনুষ্ঠানে থাকা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এক্সে লেখেন, সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন, সব তরুণকে গ্রেপ্তার করুন, আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন। আমরা আপনাদের ঘিরে ফেলছি, পিছু হটব না। আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আছে। ভারতের তরুণেরা, তোমাদের নিয়ে গর্বিত, বিক্ষোভ চালিয়ে যাও।

অন্য ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এদের মূল বৈশিষ্ট্য কাপুরুষতা। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, মোহন ভাগবত, জ্ঞানেশ কুমার ও অজিত দোভাল এই গল্পের খলনায়ক। তাদের চারপাশে জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন, তার ১৫ বছরের রাজনৈতিক নাটক শেষ হতে চলেছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়া জোট রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করার দাবি জানায়। বৈঠকের পর রাহুল বলেন, রাষ্ট্রপতি ভোট চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেননি।

রবিবার ফের মিছিল, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে ইন্ডিয়া জোট:

সন্ধ্যায় যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে সিজেপি নেতা অজিঙ্ক শিন্দে বলেন, এভাবে আটকানো যাবে না। শনিবারের কর্মসূচিকে অর্ধজয় হিসেবে দেখছে সিজেপি। তিনি ঘোষণা করেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা বা তাকে না সরানো পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল বের হবে। রবিবার (১১ অক্টোবর) আরও শক্তিশালী হয়ে রাস্তায় নামবেন তারা। কেন্দ্রীয় সরকার ভয় পেয়ে রাজধানী অচল করেছে।

এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, রবিবার থেকে ছাত্র বিক্ষোভ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে। সর্বত্র শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হবে, পুলিশ যেখানেই ব্যারিকেড দেবে, সেই এলাকাই যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদেও সমর্থনে বিক্ষোভ হয়। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়।

বিজেপির পাল্টা, জোটের চার দফা: 

বিজেপি মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, ভারত কলার প্রজাতন্ত্র নয়। মোদীর নেতৃত্বে দেশ কখনো নত হয়নি। ভারতীয় গণতন্ত্র নৈরাজ্যের চেষ্টা ঠেকিয়েছে। দেশ চলবে সংসদ দিয়ে, রাজপথ দিয়ে নয়। তিনি আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পুদুচেরির উপনির্বাচনে এনডিএর জয়ের কথা তুলে ধরেন।

ইন্ডিয়া জোটের রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে চার দফা দাবি — জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও ২০২৩ সালের আইন বাতিল, এসআইআর স্থগিত করে ১৩.৩ কোটি বাদ পড়া ভোটার ফেরানো, সব নির্বাচনে ব্যালট পেপারে ফেরা এবং গত দুই বছরে ভোট চুরির প্রমাণ থাকা বিধানসভা নির্বাচন বাতিল। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি দেবে জোট। কর্মী সোনম ওয়াংচুক বলেন, দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে, কালকের মধ্যে মুক্তি না দিলে অনশন বা পদযাত্রার কথা ভাববেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত