‘সরকারি চাকরি মানে সোনার হরিণ’ আমাদের সমাজে অনাকাক্সিক্ষতভাবে এই বাক্যবন্ধটি বহুল প্রচারিত। জার্মান ফ্যাশন ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার ও শিল্পী কার্ল লেগারফেল্ড বলেছেন, ‘আমি নিজেকে পুনরায় উদ্ভাবন করতে পছন্দ করি কারণ এটি আমার কাজের অংশ’। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় উদ্ভাবন তো কদাচিৎ বিষয়। জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন কাজের, বিশেষ করে যোগ্যতা সত্ত্বেও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে এরই চিত্র উঠে এসেছে ১২ অক্টোবর দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। ‘ভেরিফিকেশনের ফাঁদে মেধা’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের গর্ভে যোগ্যতা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই কীভাবে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়; এরই খণ্ডিত অনভিপ্রেত বিষয় উঠে এসেছে। আরও বলা হয়েছে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক এই তিন ধাপের কঠিন প্রতিযোগিতা পেরিয়ে দেশে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পাওয়ার পরও সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা নেই! শেষ ধাপে এসে ‘ভেরিফিকেশন’ নামের আরেক পরীক্ষায় আটকে যেতে পারেন একজন চাকরিপ্রার্থী! এমনকি প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তাও জানতে পারেন না ভুক্তভোগী!
ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ৬৬৮ জনের মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বাদ পড়েন ৫৭ জন। গেজেটে তাদের বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়, এর আগেও এমন নজির আছে। আমরা জানি, ব্রিটিশ আমলে ১৯২৮ সাল থেকে ভেরিফিকেশনের প্রচলন শুরু হয়। ভেরিফিকেশনের গুরুত্ব আমরা অস্বীকার করি না। এর মধ্যে দিয়ে সাধারণত প্রার্থীর আদালত কর্র্তৃক দণ্ডিত হওয়ার বিষয়টি নির্ণয় হতে পারে। কারণ, একজন সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী জনগণের সেবক, রাষ্ট্রের কাঠামোর অংশ; তাই তার স্বচ্ছতা-নৈতিকতা ও নিরপরাধের বিষয়গুলো গণ্য হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে রাজনৈতিক কিংবা প্রার্থীর পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো বিবেচ্য হতে পারে না। যে প্রার্থী বিসিএসের পরীক্ষাপর্বে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের অপেক্ষায় প্রহর গুনবেন, তিনি রাজনৈতিক কিংবা অজানা কোনো কারণে নিয়োগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন, তা শুধু আক্ষেপের নয়, রীতিমতো অবিচার বলে আমরা মনে করি। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে মেধা-যোগ্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটিও। কারণ মেধা কিংবা যোগ্যতার পরীক্ষায় সফল বলেই প্রার্থীকে উত্তীর্ণের তালিকাভুক্ত করা হয়।
যে প্রার্থী পরীক্ষার স্তরগুলো অতিক্রম করে কৃতকার্য বা সফল হলেন তাকে যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে তো বটেই, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন থামেনি। এই বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক বৈষম্যের বৃত্তবন্দি করে প্রতিবিধানের দাবি জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না, এমনটি রীতিমতো চরম অনৈতিক এবং একই সঙ্গে প্রশ্নাতীতভাবে নিন্দার। আমরা এই ‘ট্যাগের’ অপসংস্কৃতির নিরসন চাই এবং এমন কদর্যতা রাষ্ট্র ও সমাজকে কলঙ্কিত করে, তাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমরা চাই, মেধা-যোগ্যতাই হোক চাকরিপ্রাপ্তির একমাত্র নিরিখ। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, সরকারি চাকরি কোনো ডিলারশিপ কিংবা ঠিকাদারির বিষয় নয়। এও মনে রাখা প্রয়োজন, কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকা মানেই অপরাধী হিসেবে গণ্য হওয়া নয়। যে পর্যন্ত না আদালত কর্র্তৃক কেউ দণ্ডিত হবেন সেই পর্যন্ত তাকে অপরাধী বলার অবকাশ নেই।
নিজস্ব জমি বা বাড়ি না থাকার কারণে চাকরি আটকে যাওয়ার ঘটনাও অতীতে সংবাদমাধ্যম মারফত জানা গেছে, যদিও পরে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এর নিরসন ঘটে। দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনেই প্রকাশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য করা হবে না। আর শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, অধিকংশ সময় অতিউৎসাহী ও অতিরঞ্জিতভাবে রিপোর্ট দেওয়া হয়। আমরা সরকারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এই মন্তব্যগুলোর প্রেক্ষাপটে বলতে চাই, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়। অনৈতিকতার স্রোতে যেন নৈতিকতা-দায়বদ্ধতা-ন্যায়বিচার ভেসে না যায়। রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকারের ভূমি হবে সমতল, এটিই সংগত প্রত্যাশা। যারা বাদ পড়েছেন দ্রুত তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে ব্যবস্থার সংস্কারের ওপরও আমরা জোর দিই।