মনোহর লজ্জাবতীলতা

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩১ এএম

‘লজ্জাবতীলতা উটি অতি মনোহর।

যদিও সুন্দর শোভা নাহি তত মনোলোভা,

তবুও মলিন বেশ মরি কি সুন্দর।’

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (লজ্জাবতীলতা)

কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) ছিলেন পেশায় উকিল। তার ‘কবিতাবলী’ কবিতা সংকলনের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১২৭৭ বঙ্গাব্দে, আর দ্বিতীয় খন্ড ১২৮৬ বঙ্গাব্দে। প্রথম খন্ডে ‘লজ্জাবতীলতা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রকৃতির শোভা দেখে তার মনে যেসব ভাবের উদয় হয়েছিল তা তিনি কবিতাকারে লিখেছিলেন। প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদের স্বভাবের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানব বৈশিষ্ট্যের এক আশ্চর্যজনক মিল। ‘লজ্জাবতীলতা’ কবিতাটিতে লজ্জাবতী লতার কোমলতা ও সঙ্কোচকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে কবি মূলত সমাজের নিরহংকার ও মৃদুভাষী মানুষের প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। দীর্ঘ সে কবিতাটির শেষে এসে দেখা যায়, কবির সেই সাবধানবাণী ‘সমাজের প্রান্ত ভাগে তাপিত অন্তরে জাগে,/ মেঘে ঢাকা আভাহীন নক্ষত্র যেমন।/ ছুঁইও না উহার দেহ করি নিবারণ;/ লজ্জাবতী লতা উটি মানসরঞ্জন।’ লজ্জাবতী লতার যে লজ্জা আছে সেটি কবিও বুঝেছিলেন।

অনেকেই লজ্জা পেলে যেমন সংকুচিত হয়ে যায়, লজ্জাবতী লতাও ঠিক তেমনই। পাতাগুলো ছুঁলেই ভাঁজ হয়ে যায়। এজন্য এ গাছকে ইংরেজিতে বলে শাই প্ল্যান্ট, সেনসিটিভ প্ল্যান্ট, অ্যাকশন প্ল্যান্ট, শেমপ্ল্যান্ট, টাচ-মি-নট ইত্যাদি। স্পর্শ করার কিছুক্ষণ পর আবার বন্ধ পাতা খুলে যায়। তা ছাড়া শুধু নাড়া দিলে বা স্পর্শ করলেই যে লজ্জাবতীর পাতা বন্ধ হয়ে ঢলে পড়ে তা না দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও সেসব পাতারা নিদ্রায় ঢলে পড়ে। সকালে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেগুলো জেগে ওঠে।

শিশুকালে লজ্জাবতীর পাতা ছোঁয়া ছিল আমাদের এক মজার খেলা, বিস্ময়েরও। অনেক জায়গায় প্রায়ই এ গাছের সঙ্গে দেখা হয়। দেখেছি লজ্জাবতী লতার জীবনের বিভিন্ন রূপ পরিবর্তনও, গোলাপি বলের মতো ফুল থেকে থোকা ধরা খাটো খাটো শিমের মতো ফল, আর ফাটা ফলের ভেতরের বীজও। কিন্তু কাঁটার খোঁচা খাওয়ার ভয়ে সব সময়ই সাবধান থাকতে হয়েছে। প্রায় ১৬ বছর আগে গাজীপুরে সার্ডির (বর্তমানে নাটা) মাঠে লজ্জাবতীর বীজ ছিটিয়ে এক ধরনের কাঁটাবিহীন লজ্জাবতীর চাষ করতে দেখেছিলাম, তখন সে ভয় কেটে গিয়েছিল। বন্য লজ্জাবতীর চেয়ে সেসব গাছ ছিল বেশি লম্বা ও লতানো, কোমল, ফুলগুলো ছিল সাদা। পরে জেনেছিলাম, থাইল্যান্ড থেকে সেসব বীজ আনা হয়েছে সবুজ সার হিসেবে চাষের জন্য। বীজ বুনে সেসব কচি গাছ চাষ দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে মাটির উর্বরতা বাড়ে।

শিমগোত্রীয় গাছের ধর্মই তাই। ওরা বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটির নিচে নিজেদের শিকড়ে এক ধরনের গুটির মধ্যে জমিয়ে রাখে। তাই সে গাছগুলো চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটি পুষ্টি পায়। বন্য লজ্জাবতী গাছেরও সে গুণ আছে। তবে কাঁটা থাকায় ও শক্ত ধাঁচের উদ্ভিদ হওয়ায় তা সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। বরং ওরা যেসব ফসলের জমিতে জন্মে সেখানে আগাছা বা আপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু অনেকেই উপকার পান তার ঔষধি গুণের কারণে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যে, লজ্জাবতী লতা দূষিত মাটি থেকে তামা, সিসা, টিন ও দস্তার মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু নিষ্কাশন করে নিজেদের পাতায় জমিয়ে রাখে। এর ফলে মাটি ধীরে ধীরে কম বিষাক্ত অবস্থায় ফিরে আসে। লজ্জাবতীর শিকড় কার্বন-ডাইসালফাইড তৈরি করে, যা উদ্ভিদের মূলাঞ্চলের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু রোগসৃষ্টিকারী ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করে।

১৭৫৩ সালে কার্ল লিনিয়াস তার বিখ্যাত গ্রন্থ স্পিসিস প্লান্টারামে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে লজ্জাবতী উদ্ভিদের বর্ণনা প্রদান করেন। শিম বা ডালগোত্রীয় তথা ফ্যাবেসী গোত্রের এ উদ্ভিদের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Mimosa pudica. এই প্রজাতিগত নামের শেষাংশ পুডিকা একটি লাতিন শব্দ, যার অর্থ হলো ‘লজ্জা’, ‘লাজুক’ বা ‘কুঁচকে যাওয়া’। স্পর্শের প্রতিক্রিয়ায় এর সংকুচিত হওয়ার বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করেই এই নামকরণ করা হয়েছে। লজ্জাবতী একটি কাঁটাযুক্ত লতানো উদ্ভিদ। এর লতাগুলো ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা যৌগিক, পত্রদ-ের দুপাশে পক্ষলভাবে ছোট ছোট পত্রক সারি করে সজ্জিত থাকে। শরত-হেমন্তে বেশি ফুল ফোটে। লম্বা ডাঁটার শীর্ষে গোলাপি বা হালকা বেগুনি রঙের পুষ্পম-ুক উৎপন্ন হয়। পুরনো গাছে বেশি ফুল ফোটে। লজ্জাবতী গাছকে যত্রতত্র ডাঙ্গা জায়গায় আমরা দেখতে পাই। তাই বলে সে কিন্তু আমাদের দেশীয় গাছ না। ওদের আদি বাসভূমি ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা। আমাদের দেশে বনফুল হিসেবে সুন্দর শোভাদায়ক হলেও আসলে সে আপদ। যেখানে জন্মে, সেখান থেকে সহজে উচ্ছেদ করা যায় না।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত