চাপা গলায় কথা বলা, চোখে চোখ রেখে তাকানো, আর হঠাৎ রাগে ফেটে পড়া। নতুন প্রজন্মের কাছে নানা পাটেকার মানে প্রধানত ওয়েলকাম-এর সেই উদয় শেঠি, যার সংলাপ আজও মিম হয়ে ঘোরে। কিন্তু ৮ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যিনি চলে গেলেন, তাকে উদয় শেঠির চেয়ে অনেক বড় করে দেখা দরকার। ৭৫ বছর বয়সী এই অভিনেতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে গমন ছবি দিয়ে। তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রী পেয়েছেন। এই লেখা সেই নানার কাছে ফেরার একটা আমন্ত্রণ, যাকে হাসির ছবির আগে আমরা দেখিনি।
অঙ্কুশ (১৯৮৬)
বেকার, ক্ষুব্ধ কয়েকজন তরুণের গল্প অঙ্কুশ। এখানে নানা ছিলেন রবি, যে চরিত্রের ভেতরে জমে থাকা রাগ পর্দা ফুঁড়ে দর্শকের গায়ে লাগে। ছবির প্রার্থনা-গান “ইতনি শক্তি হমে দেনা দাতা” পরে বহু স্কুলের সকালের সমাবেশে গাওয়া হয়েছে। পরবর্তী দশকের “অ্যাংরি ম্যান” নানার সূত্রপাত দেখতে চাইলে এখান থেকেই শুরু করা যায়।
প্রহার (১৯৯১)
প্রহার-এ নানা শুধু মেজর চৌহান নন, পরিচালকও। সেনা কর্মকর্তার চরিত্রের জন্য তিনি সত্যিকারের সেনা-প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন পদ পান। ছবির শৃঙ্খলা, কমান্ডো-প্রশিক্ষণের কঠোরতা আর দেশপ্রেমের আবেগ দেখলে বোঝা যায়, এটা নিছক অভিনয় ছিল না। চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার এই জেদই নানার পরিচয়।
রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান (১৯৯২)
শাহরুখ খানের প্রথম দিকের এই ছবিতে নানা ছিলেন জয়, এক পথনাট্যশিল্পী, যে রাজুকে শহরের পথ চেনায়। কঠিন চরিত্রের বাইরে তার এই কোমল, রসিক রূপ বিস্ময়কর। নানার মৃত্যুর পর শাহরুখ স্মৃতিচারণ করেছেন, প্রথম দেখায় নানা তার চুলে হাত দেওয়া থামিয়ে বলেছিলেন, ‘হিরোর মতো চুল বানাস না তুই অভিনেতা।’ ওই এক বাক্যে নানাকে চেনা যায়। তারকাখ্যাতির চেয়ে তিনি অভিনয়কে বড় করে দেখতেন।
খামোশি : দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬)
সঞ্জয় লিলা বনসালির প্রথম ছবিতে নানা বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবা জোসেফ। যে অভিনেতা কণ্ঠের জোরে পরিচিত, তিনি এখানে প্রায় কথা ছাড়াই দর্শককে কাঁদান। মেয়ে অ্যানির (মনীষা কৈরালা) গানের স্বপ্ন আর বাবার চোখের ভাষা মিলিয়ে ছবিটা এক অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা। ওয়েলকাম-এর নানা আর খামোশি-র নানাকে পাশাপাশি দেখলে অভিনেতার পরিসরটা বোঝা যায়।
ত্রিশাগ্নি (১৯৮৮) ও যুগপুরুষ (১৯৯৮)
এই দুটি ছবি তুলনামূলক কম আলোচিত, আর সেটাই এর আকর্ষণ। এক দশকের ব্যবধানে দুই ছবিতে দেখা যায় তরুণ নানার ক্ষুধা আর পরিণত নানার সংযম। যুগপুরুষ-এ তিনি ছিলেন অনিরুদ্ধ। ভিন্ন সময়ের এই কাজগুলো সাজিয়ে দেখলে একজন শিল্পীর বদলে যাওয়ার ছবিটা পরিষ্কার হয়।
আজকের দর্শকরা সংলাপের ছোট ক্লিপ আর রিলে অভ্যস্ত। নানার এই ছবিগুলো উল্টো কথা বলে। এখানে অভিনয় মানে অপেক্ষা, নীরবতা আর হঠাৎ বিস্ফোরণ।