গ্রেপ্তার ৭, মূলহোতা অধরা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রশ্ন বাবদ ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নিত। গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই সরকারি কর্মচারী। তারা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মরত। বাকি দুজন তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। গত ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিল, উত্তরখান, মিরপুর, সাভার ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। 

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটি দাবি করেছেন এসআরবি-৩-এর আর্টিলারি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি জানান, গ্রেপ্তার সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর ও এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। অন্য দুজন হলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলাম। এ ছাড়া চক্রের অন্য দুই সদস্য মো. মফিজুল ইসলাম ও তার সহযোগী মো. হাসানুর রহমান সুজন।

ফায়েজুল আরেফীন জানান, পরীক্ষার দিন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ছবিটি জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠান। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর নূর মোহাম্মদ উত্তরপত্র তৈরি করেন। পরে বিতরণকারীদের মাধ্যমে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। চক্রটি গত তিন থেকে চার বছর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি করে আসছিল। কোনো দপ্তরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করত। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করা হতো। এ জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক ব্যবহার করা হতো। জামানত হিসেবে পরীক্ষার্থীদের মূল সনদপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেখে দেওয়া হতো। পরীক্ষার হলে উত্তর সরবরাহের জন্য পরীক্ষার্থীদের কানে বা চুলের মধ্যে সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক ডিভাইস লুকিয়ে দেওয়া হতো। তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির জন্য চক্রটি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিত। অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৬০টির বেশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ১৯টি প্রবেশপত্র, ১০টি মূল সনদপত্র, ব্যাংকের চেক, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের কে বা কারা প্রশ্ন দিয়েছে বা এর মূলহোতা কে সেটি নিশ্চিত করতে পারেননি এসআরবির এই কর্মকর্তা। মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য চক্রকে শনাক্ত করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। পরে শনিবারই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। গতকাল শুক্রবার এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এর আগে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় গতকাল অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে রাতভর মন্ত্রণালয়ে অবস্থান প্রতিমন্ত্রীর: প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত হওয়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে রাতভর মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর প্রায় শতাধিক কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে গত ১০ অক্টোবর বেলা ১১টায় এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় তা স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়। পরে নতুন তারিখ নির্ধারণ করে শুক্রবার পরীক্ষা নেওয়া হয়।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এড়াতে এবার বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতভর মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আগেরবার ওঠা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর এবার যাতে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে নজরদারি করা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র যাতে কোনোভাবেই ফাঁস না হয়, সে জন্য পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সচিবালয়ে অবস্থান করেন আমিনুল হক। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ তদারক করতে মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ নিয়োগ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারাও সেখানে ছিলেন। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ করা ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়। পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে পুলিশি পাহারায় প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়।

১১তম গ্রেডের ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত করার পর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ফলে পরীক্ষাটি ঘিরে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। আগের নির্ধারিত তারিখে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিতেও পড়তে হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর পরীক্ষা স্থগিত এবং নতুন তারিখে পরীক্ষা আয়োজনের ঘটনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিমন্ত্রীর রাতভর মন্ত্রণালয়ে অবস্থান এবং পরীক্ষার আয়োজন কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত