‘আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে তখন হলুদ নদী
নরম-নরম হয় শর কাশ হোগলায়মাঠের ভিতরে!’
জীবনানন্দ দাশ (কুড়ি বছর পরে)
বাঙালি সংস্কৃতিতে কার্তিক মাস পবিত্র, মহিমান্বিত এবং বন্দনার মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই মাসটি বাংলা সালের সপ্তম এবং এটি রূপসী বাংলার শরতের শেষ ও হেমন্ত শুরুর সন্ধিক্ষণ। এ সময়ে প্রকৃতিতে এক অনবদ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শিউলি ফুলের সুবাস যেন কার্তিকের বাতাসকে স্নিগ্ধ করে। বিল ও ঝিলের পানিতে শাপলা ও পদ্ম ফুলের সমারোহ, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়ায়। কার্তিক মাসের ভোরের আকাশে হালকা কুয়াশার স্তর দেখা যায়। ঘাসের ডগা ও ধানের শীষে ভোরের শিশির বিন্দু জমতে শুরু করে। যেটি সূর্যের আলোয় মুক্তোর মতো চকচক করে। মেঘমুক্ত, স্বচ্ছ নীল আকাশ কার্তিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মাঝেমধ্যে সাদা মেঘের ভেলা দেখা গেলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারে কমে আসে। এই মাসে আমন ধান পেকে সোনালি রঙ ধারণ করতে শুরু করে। তখন বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধানের শীষগুলো বাতাসে দোল খায়। ঠিক তখনই নবান্নের আশা জাগায় কৃষকের হৃদয়ে। ঐতিহাসিকভাবে কার্তিক মাসকে গ্রামীণ বাংলায় কিছুটা অভাবের মাস বা ‘মরা কার্তিক’ বলা হতো। কারণ এ সময়ে আগের ফসলের মজুদ ফুরিয়ে আসত এবং মাঠের নতুন আমন ধান কাটার উপযোগী হতে কিছুদিন সময় লাগত। অবশ্য আধুনিক কৃষিব্যবস্থার কারণে এই রূপ অনেকটা বদলে গেছে।
সনাতন ধর্মে কার্তিক মাসকে বলা হয় ‘দামোদর মাস’। এটি পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনার জন্য বছরের সবচেয়ে সেরা সময় বলে গণ্য করা হয়। পদ্মপুরাণ ও স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, ১২ মাসের মধ্যে কার্তিক মাস শ্রীবিষ্ণু ও শ্রীমতী রাধারানীর সর্বাধিক প্রিয়। মাসটির মূল দর্শন হলো ভক্তি, ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং আলোর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জাগরণ। কার্তিক মাস অন্ধকারের ওপর আলো এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক। এর শান্ত ও মনোরম পরিবেশ গ্রামীণ ও শহর জীবনে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের লক্ষ্মীপূজা, কার্তিক পূজা এবং শ্যামাপূজা-দীপাবলি উদযাপিত হয়। মাসটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস হলেও উপমহাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে এ সময়ের গভীর ও ভিন্নধর্মী আধ্যাত্মিক মর্ম রয়েছে। শরৎ ও হেমন্তের এই সন্ধিক্ষণটি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের নয়, বরং আত্মশুদ্ধি-আলোক বন্দনা-ত্যাগের প্রতীক। অনেকে পুরো মাসজুড়ে নিরামিষ আহার গ্রহণ, তুলসী দেবীর পূজা এবং কঠোর আত্মসংযম পালন করেন, যা ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও মন পবিত্র করতে সাহায্য করে। শিখ সম্প্রদায়ের জন্য কার্তিক মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এ সময়ে তারা দুটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় উদযাপন করেন। ষষ্ঠ শিখ গুরু হরগোবিন্দ জি গোয়ালিয়র, ৫২ জন হিন্দু রাজাসহ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন কার্তিক মাসের দীপাবলির দিন। যে কারণে এটি ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার প্রতীক। শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক দেব, কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ দিনটিকে গভীর ভক্তিভরে ‘গুরুপরব’ হিসেবে পালন করেন, যার মূল বাণী হলো মানবতার সেবা ও ঈশ্বরের নাম জপ। জৈন ধর্মে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী ও অমাবস্যার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। মহাবীরের প্রয়াণের পর পৃথিবী যেন অন্ধকারে তলিয়ে না যায়, সেজন্য তার অনুসারীরা প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন। জৈনদের কাছে এটি বাহ্যিক উৎসবের চেয়ে বেশি, আত্মার মুক্তি ও অহিংসার মর্মবাণী ছড়ানোর দিন। বৌদ্ধ ধর্মে, কার্তিক মাসের পূর্ণিমা অত্যন্ত পবিত্র। এই সময়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী ‘বর্ষাবাস’ বা কঠোর ধ্যান-সাধনার সমাপ্তি হয়। ভিক্ষুরা ‘প্রবারণা পূর্ণিমা’ পালনের মাধ্যমে নিজেদের ভুলত্রুটি স্বীকার করে একে অপরের কাছে ক্ষমা চান। এরপর মাসব্যাপী চলে ‘কঠিন চীবর দান’ উৎসব যা দানশীলতা, উদারতা এবং ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত।
হেমন্ত যেন সাহিত্যে অনেকটা অনাদৃত। যদিও বাংলা ভাষার কবি ও সাহিত্যিকরা ঋতু ও প্রকৃতির অজস্র বন্দনা করেছেন। কিন্তু হেমন্ত নিয়ে তেমন কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ নেই। চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রম শুধু জীবনানন্দ দাশ। তিনি হেমন্তকে নানাভাবে দেখেছেন। ব্যবহার করেছেন কবিতায় এমন অনেক শব্দ, যা হেমন্তের সমার্থক। এ জন্য একমাত্র জীবনানন্দকে বলা হয় ‘ধূসর ঋতু হেমন্তের কবি’। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ভিন্ন হলেও এই মাস অধিকাংশ ধর্মের মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরা, অহংকার ত্যাগ করা এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের এক সর্বজনীন বার্তা দেয়। কার্তিক মাসের মূল দর্শন হলো বাহ্যিক জাঁকজমক ত্যাগ করে মনকে স্রষ্টার কাছে সমর্পণ এবং প্রদীপের আলোর মতো জীবনকে পবিত্র জ্ঞানে আলোকিত করা। জীবনে তখনই পরম শান্তি।