ভারতের দিল্লিতে ভোট কারচুপির অভিযোগের প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনের অংশ হিসেবে দুই যুবনেতাকে আটক করার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপ্রদেশের অখিলেশ যাদব, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন এবং দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহ বিরোধী দলের নেতারা 'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক এবং আইসার প্রধান নেহা বোরার সমর্থনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। খবর এনডিটিভি'র।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) কনাট প্লেসে পূর্বপরিকল্পিত 'লেহরা দো তিরাঙ্গা' বা ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি 'তেরঙা যাত্রায়' যোগ দিতে যাওয়ার ঠিক আগে অভিজিৎ দীপককে তার দিল্লি বাসভবন থেকে তুলে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, নেহা বোরা জনন্তর মন্তরের দিকে যাচ্ছিলেন, যা গত সপ্তাহে প্রতিবাদের স্থান হিসেবে বাতিল করা হয়েছে এবং তিনিও এই বৃহত্তর বিক্ষোভের অংশ ছিলেন।
তীব্র পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যেই শত শত বিক্ষোভকারী কনাট প্লেস এবং মান্ডি হাউসে জড়ো হয়ে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে শতাধিক জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, এই বিক্ষোভের কোনো অনুমতি ছিল না এবং পতাকা বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছিল, যে কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কনাট প্লেসে যাওয়ার পথে বাসভবন থেকে পুলিশ অভিজিৎ দীপককে আটক করে এবং মান্ডি হাউসের কাছ থেকে নেহা বোরাকে আটক করা হয়।
কংগ্রেস জানিয়েছে যে দলটি 'আজ গ্রেপ্তার হওয়া সমস্ত বিক্ষোভকারীদের পাশে রয়েছে'। দলটির এক্স-এর একটি পোস্টে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে নিশানা করে বলা হয়েছে, ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে তারা একসঙ্গে লড়ব। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও প্রশ্ন তোলেন কেন পুলিশ গভীর রাত পর্যন্ত বোরাকে কোথায় রাখা হয়েছে তা প্রকাশ করছে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স-এ লেখেন, 'দিল্লি পুলিশ কী করতে চাইছে? ভারতীয় জাতীয় পতাকা বহন করার জন্য অভিজিৎ দীপককে আটক করা হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, স্বাধীন ভারতে যুবসমাজকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার জন্য আটক করা হচ্ছে, যা অঘোষিত জরুরি অবস্থার সমান এবং একটি ফ্যাসিস্ট জমানার আচরণ।
তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন প্রশ্ন তোলেন যে ওই দুজনকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে। তিনি এক্স-এ পোস্ট করে বলেন, 'তাদের অবস্থান গোপন রেখে আটক রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অমানবিক। কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দিতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে দমনপীড়ন বন্ধ করতে হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, অভিজিৎ দীপককে জাফরণ কালান থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আইসা জানায় যে বোরাকে মঙ্গলপুরীর অ্যান্টি-নারকোটিক টাস্ক ফোর্সের কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
অরবিন্দ কেজরিওয়াল কেন্দ্র সরকার ও পুলিশের এই পদক্ষেপকে চরম একনায়কতন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে আপ প্রধান বলেন, 'তেরঙা (ভারতের জাতীয় পতাকা) ওড়ানো কি কোনো অপরাধ?'
অন্য একটি পোস্টে কেজরিওয়াল লিখেছেন, 'আমরা যদি নিজেদের দেশে তেরঙা না ওড়াই, তবে কি পাকিস্তানে ওড়াব? যাদের ভারতীয় তেরঙার প্রতি সমস্যা রয়েছে, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত।'
বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে এই বিক্ষোভগুলি নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা এবং ভোট কারচুপির অভিযোগগুলি কংগ্রেসের পরাজয় স্বীকার করতে না পারার অক্ষমতা। বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী বলেন, 'তাদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্র বাঁচানো নয়, বরং বিদেশি প্রভুদের ইশারায় কাজ করা এবং দেশে নৈরাজ্য ছড়ানো।'
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সাম্প্রতিক আটকের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি, যদিও গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা চলমান বিক্ষোভের অংশ হিসেবে তিনি নিজে পদযাত্রা নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগে দিনে, দিল্লি পুলিশের ২০ জনেরও বেশি কর্মী দীপকের বাড়িতে যান এবং তাকে একটি নোটিশ দেন।
পুলিশ দীপককে জানায় যে জাতীয় পতাকা ওড়ানো বেআইনি নয়, কিন্তু অনুমতিহীন মিছিল বের করা এবং ভিড় জমানো আইনবিরুদ্ধ হবে। দীপক বলেন, 'আমি নয়া দিল্লি যেতে পারছি না, অন্য কোথাও তো যেতে পারি, আমি কোন আইন ভেঙেছি?'
রাতের দিকে পুলিশ জানায় যে বরাখম্বা রোড, মান্ডি হাউস এবং অন্যান্য স্থান থেকে শশতাধিক জনকে আটক করা হলেও কনাট প্লেসের ইনার সার্কেল থেকে কাউকে আটক করা হয়নি। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে অংশগ্রহণকারীদের 'তেরঙা' নিয়ে মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সমস্ত মেট্রো স্টেশন এবং বাজার খোলা ছিল, ইন্টারনেট পরিষেবা সচল ছিল এবং স্বাভাবিকভাবে যান চলাচল অব্যাহত ছিল। কনাট প্লেসে ১৫-২০ মিনিটের একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয় এবং বিক্ষোভকারীরা ইনার সার্কেলের তিনটি চক্কর সম্পন্ন করেন।