নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানে শিল্পকারখানার অনুমোদন, এফএআর বৃদ্ধি, বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প ঢাকার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের নামে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং যথাযথ পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ও কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়াই যে গেজেট অনুমোদন করা হয়েছে, সেটি অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আইপিডি জানায়, ২০২২ সালে ড্যাপ প্রণয়নের পর চার বছরে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সরকার—আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন ও বিএনপি সরকার—স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে শহরের পরিবেশ, বাসযোগ্যতা ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরও আত্মবিধ্বংসী এই প্রবণতার কোনো পরিবর্তন হয়নি—বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। পরিকল্পনা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জনস্বার্থের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছে একের পর এক সরকার। ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো যদি এভাবে পরিকল্পনা পরিবর্তন করা যায়, তাহলে সরকারের পরিবেশ ও পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষিত অঙ্গীকার অন্তঃসারশূন্য বলে প্রতীয়মান হবে।
আইপিডি মনে করে, ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিবর্তনের দলিল নয়। এটি ঢাকার ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, জনসংখ্যা, জনঘনত্ব, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ ধরনের পরিকল্পনা সংশোধন করা হলে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আইপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ড্যাপের তৃতীয় দফার সংশোধন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ভালো-মন্দ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা এবং কারিগরি মূল্যায়নের বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আরও উদ্বেগজনক হলো, ড্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পর্যায়েও সংশোধন সম্পর্কে অবগত না থাকার তথ্য জানা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংশোধনের সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায়, কার সুপারিশে এবং কোন কারিগরি যুক্তিতে নেওয়া হয়েছে, সেটাই প্রশ্নবোধক।
আইপিডি মনে করে, ড্যাপের আগের সংশোধনগুলোতেও এফএআর ও ডুয়েলিং ইউনিট (কাঠাপ্রতি পরিবারসংখ্যা) বাড়ানোর ক্ষেত্রে শহরের ধারণক্ষমতা, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জনস্বার্থের যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবারের সংশোধনেও শিল্প ও আবাসন খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
আইপিডি বিশ্বাস করে, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর দাবি বা প্রভাবের ভিত্তিতে নগর পরিকল্পনার বিধান পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তা পরিকল্পনা প্রণয়নের পেশাগত পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নগরের পরিবেশগত সুরক্ষা, অবকাঠামোগত ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি বাসযোগ্যতাকে উপেক্ষা করা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বুড়িগঙ্গার তীর, জুরাইন ও পোস্তগোলার মতো পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকায় নদীতীরবর্তী ড্যাপে চিহ্নিত উন্মুক্ত স্থানে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমোদন সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কারণ, বিদ্যমান শিল্প ও কলকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে এমনিতেই নদীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, নদীদূষণ, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ঢাকার বাসযোগ্যতা ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’সহ প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
একইভাবে, বন্যাপ্রবাহ এলাকা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ ও জলাশয়ে আবাসন প্রকল্পের সুযোগ বাড়ানো হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকা নগরের পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর সুরক্ষা দুর্বল করার ফলে সৃষ্ট ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারাও তার মাশুল দেবেন।
আইপিডির মতে, পূর্বাচলসহ পরিকল্পিত এলাকার মূল নকশায় নির্ধারিত জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির সুপারিশ বিবেচনা না করে বারবার ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বৃদ্ধি করা হলে পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ভবনের আয়তন বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার আগে সড়ক ও গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, অগ্নিনিরাপত্তা, উন্মুক্ত স্থান এবং পরিবেশগত ধারণক্ষমতার পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আইপিডি মনে করে, পরিকল্পনা সংশোধন কোনো গোপন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। ড্যাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ, পেশাগত মতামত এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পরিবর্তন হলেও পরিকল্পনার মৌলিক লক্ষ্য ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনা প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং নগর উন্নয়ন ব্যবসায়িক ও তাৎক্ষণিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক নগর গড়ে তোলার প্রত্যাশার বিপরীতে এ ধরনের বিতর্কিত সংশোধন জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বায়ুদূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা ও উন্মুক্ত স্থানের সংকটে জর্জরিত ঢাকায় নতুন করে পরিকল্পনার ব্যত্যয় এবং পরিবেশগত সুরক্ষা দুর্বল করার সিদ্ধান্ত নগরের বিদ্যমান সংকট আরও বাড়াতে পারে।
উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে আইপিডি ছয় দফা সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো—
1. ড্যাপের তৃতীয় দফার বিতর্কিত সংশোধনীসংবলিত গেজেট অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
2. গেজেটের মাধ্যমে করা এবারের সংশোধনের পেছনে কী পরিকল্পনাগত কারণ ও বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং কারা এর সুপারিশ করেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
3. এবারের সংশোধনসহ ড্যাপের ইতিপূর্বে করা বিভিন্ন সংশোধনের কারিগরি তদন্ত করে এর পেছনে দুর্নীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করছে কি না, তা উন্মোচন করতে হবে।
4. বন্যাপ্রবাহ এলাকা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, নদীতীর, জলাশয়, পার্ক, খেলার মাঠ ও অন্যান্য উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের বিধান কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। এসব এলাকার সুরক্ষা দুর্বল করে কোনো গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না।
5. এফএআর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পরিকল্পিত জনসংখ্যা, নাগরিক অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
6. ভবিষ্যতে ড্যাপ সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, পেশাগত পরামর্শ, কারিগরি মূল্যায়ন, পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থ যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।