বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর অবস্থানে মাখোঁ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম

শিক্ষার মানোন্নয়নের দাবিতে ফ্রান্সে শুরু হওয়া হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দাবানলের মতো পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রা ও আবাসন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে দেশটির হাজার হাজার মানুষ। ফলে কার্যত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে এই বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে জন-আন্দোলনে। আর এই বিক্ষোভ ঘিরে দেখা ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর-লুটপাট-অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ত্রাস ছড়িয়েছে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে। বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনায় কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। প্রয়োজনে আগামী কয়েক দিনে কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর। গত রবিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ বলেন, বৈধ দাবি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের আলাদা করে দেখতে হবে। সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে জরুরি অবস্থা বা কারফিউ জারির ঘোষণা দেননি তিনি। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, রবিবার প্যারিসে অনুমতি ছাড়া সমাবেশের পর পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও পাথর ছোড়েন।

কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্যারিসে ১০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিপাবলিক চত্বরের আশপাশে অন্তত পাঁচটি দোকানে লুটপাট হয়। লিওঁ শহরেও একটি বিলাসবহুল পোশাকের দোকানে লুটপাটের চেষ্টা ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে শ্রমিক সংগঠন, সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মী এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছিল তাদের ক্ষোভের প্রধান কারণ। সহিংসতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও বেড়েছে। কট্টর ডানপন্থি নেতা মারিন লে পেন বলেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে মাখোঁর সরকার ক্লান্ত ও দিশাহীন হয়ে পড়েছে। কট্টর বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করেছেন।

এদিকে, শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’ বলে স্বীকার করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। তিনি স্বীকার করেন যে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে ‘পূর্বাভাসের অভাব’ ছিল। বিক্ষোভের আড়ালে থাকা দাঙ্গাবাজ ও লুটপাটকারীদের বিশাল দলের মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট পুলিশ সেদিন মোতায়েন ছিল না। নুনেজ জানান, ওইদিন দেশজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার আইন প্রয়োগকারী সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এই সহিংসতার দায় নিয়ে গতকাল সোমবার নুনেজ তার পদত্যাগপত্র জমা দিলেও, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্রাসাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্ব ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নুনেজকে দায়িত্বে বহাল থাকতে বলেছেন মাখোঁ। একই সঙ্গে লুটপাটকারীদের মোকাবিলায় যত দ্রুত সম্ভব নতুন কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় গতকাল জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক করেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতি, বীমা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়গুলোতে আলোচনা কেন্দ্রে ছিল।

ফ্রান্স ছাড়াও স্পেন, পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে স্পেন ও পর্তুগালে রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। ইতালির মিলানেও বিক্ষোভকারীদের মূল উদ্বেগ ছিল পরিবারের ওপর বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ। বিক্ষোভের বারুদ ছড়িয়েছে আলবেনিয়াতেও। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ কম এবং শিক্ষার মান খারাপের অভিযোগে- দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সোমবার সপ্তম দিনে গড়িয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত