স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবর মাসেই ইতিবাচক খবর পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই প্রসঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। গতকাল সোমবার রাজধানীতে পৃথক দুই অনুষ্ঠানে তারা এ মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী ও উপদেষ্টা জানান, উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যদেশ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশ কাজ করছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ, অঞ্চল ও সংস্থার ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসবে। ‘আমি খুবই আশাবাদী, সামনের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহে আমরা বিষয়টার একটা নিষ্পত্তি দেখব।’ প্রাপ্ত সময়কে কাজে লাগাতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে সরকার। লক্ষ্য রয়েছে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার।
ইআরএফ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তিন বছর সময় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশের বাড়তি সময় পাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
তিন বছর সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি ছিল না। অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরিতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। তবে দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে লক্ষ্য রয়েছে, বাংলাদেশের উত্তরণের আগেই আলোচনা শেষ করা। ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও একই সঙ্গে চলবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তবে আশা করি জিএসপি প্লাসের অপশনটা আমাদের নিতে হবে না, তার আগেই আমরা এফটিএটা কমপ্লিট করব।’
এর সঙ্গে আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রীর ভাষ্য, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন প্রক্রিয়াগত কাজ এগোচ্ছে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনের প্রতিফলন এলডিসি উত্তরণ। তবে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক সুবিধা ভোগ করছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার হবে। এসব সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তবে এসব সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব বিভিন্ন খাত ও নীতিগত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলো কতটা ব্যবহার করছে এবং সেগুলোর ওপর কতটা নির্ভরশীল, তার ওপর এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে।
এদিকে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যদেশ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশ কাজ করছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করে তিনি এ ক্ষেত্রে ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও অন্যান্য দেশের সহযোগিতা কামনা করেন। ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে যথাযথ প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশের পর বিষয়টি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) হয়ে সাধারণ পরিষদের প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রুপ অব ৭৭ ও চীনের সঙ্গে আলোচনা এবং অনানুষ্ঠানিক দর-কষাকষিও চলছে।
তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাড়তি প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকায় ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডির রিসার্চ পরিচালক প্রফেসর মুন্সি সোলায়মান এবং ম্যাপড ইন বাংলাদেশের (এমআইবি) টেকনিক্যাল লিড প্রফেসর মতিন আব্দুল্লাহ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিজিএমইএ পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান এবং পরিচালক নাফিস উদ দৌলাসহ বিজিএমইএর অন্য নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে ড. তিতুমীর জানান, বিগত আট মাসে সরকার জ্বালানি খাতে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি প্রদান করেছে। বিগত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থানের অভাব এই তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে একটি সক্ষম ও সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং টেকসই পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের কারখানাগুলোকে আরও বেশি কমপ্লায়েন্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। বিজিএমইএর উদ্যোগে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্ম সদস্য কারখানাগুলোর পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন সংক্রান্ত কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ পর্যন্ত ৩২৬টি কারখানা এই প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করেছে, তবে এই সংখ্যাটি এখনো যথেষ্ট নয়। শিল্প খাতের সার্বিক সুরক্ষায় এটি অচিরেই সদস্যদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে এবং প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে কাজ করবে।