গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাটের রেশ কাটতে না কাটতেই আগামী শনিবার (২৪ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। হলুদ ভেস্ট গিলে জোন আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা এ কর্মসূচির নাম দিয়েছেন অ্যাক্ট টু।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পদত্যাগের দাবি সামনে রেখে আয়োজিত এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় জননিরাপত্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং স্বাভাবিক জনজীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকেই আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তাদের প্রধান স্লোগান, ম্যাক্রোঁকে সরে যেতে হবে। তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের পাশাপাশি সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি, জননিরাপত্তা এবং পুলিশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রবাসী উদ্যোক্তারাও রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা শনিবারের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
শতাধিক স্থানে জমায়েতের পরিকল্পনা ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত মানচিত্রে সারা দেশে শতাধিক সম্ভাব্য জমায়েতের স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। সোমবার দুপুর পর্যন্ত ওই মানচিত্রে ১১১টি কর্মসূচির স্থান দেখা যায়, যার মধ্যে ৮৯টি ছিল বিক্ষোভ মিছিল। তবে এসব কর্মসূচির সবগুলোর অনুমোদন, নির্দিষ্ট সময় ও চূড়ান্ত যাত্রাপথ নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একইভাবে শনিবারের আন্দোলনে কত মানুষ অংশ নেবেন, তা নিয়েও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কর্মসূচির বিস্তার ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সহিংসতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে শঙ্কা গত ১৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতার কারণে ২৪ অক্টোবরের কর্মসূচিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকবে কি না। আন্দোলনের নামে কোথাও ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে দোকানপাট, বাণিজ্যিক এলাকা, গণপরিবহনকেন্দ্র এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এ অবস্থায় পুলিশের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে শনিবারের জন্য সরকার কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা নেবে, কোথায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে কিংবা কোনো এলাকায় বিশেষ বিধিনিষেধ জারি হবে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ঘোষণার ওপর নজর রাখতে হবে।
রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে অ্যাক্ট টু ম্যাক্রোঁর পদত্যাগের দাবি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্লোগান হলেও, এই দাবি রাজনৈতিকভাবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের ব্যাপ্তি, জনসমর্থন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
শনিবারের কর্মসূচিতে ব্যাপক অংশগ্রহণ হলে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। বিপরীতে, আন্দোলন সীমিত থাকলে কিংবা জনসমর্থন প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে এর রাজনৈতিক প্রভাবও ভিন্ন হতে পারে। তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি যা-ই হোক, জননিরাপত্তা ও নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বজায় রাখার পাশাপাশি সহিংসতা ও লুটপাট প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অভিবাসী ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বাড়তি উদ্বেগ প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত অভিবাসী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য শনিবারের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মালিকানাধীন দোকান, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা এবং অর্থ স্থানান্তরকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আন্দোলনের কারণে গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়া, দোকানপাটের সময়সূচিতে পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই শনিবার যাদের কাজে বের হতে হবে, তাদের স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সংঘর্ষপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলা এবং জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ২৪ অক্টোবরের অ্যাক্ট টু কর্মসূচি ফ্রান্সের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে ম্যাক্রোঁবিরোধী আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি জোরালো করতে চাইছেন, অন্যদিকে গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শনিবারের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকবে, নাকি নতুন করে সংঘর্ষ ও নাশকতার পরিস্থিতি তৈরি হবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ।