বনের পাশে বেগুনি রঙের ফুল

প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেখা মেলে এ ফুলের। লম্বা মঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে ফোটা ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটক ও পথচারীরা।

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সড়কের পাশে দেখা মিলছে বড় বড় সবুজ পাতার ফাঁকে লম্বা মঞ্জুরিতে ফুটে থাকা বেগুনি রঙের অসাধারণ এক ফুল। এ ফুলটি সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেখা যায়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পথে ব্যাপক পরিমাণে এ ফুলটির প্রথম দেখা পাওয়া যায় বছর দুয়েক আগে। এর আগে ফুলটি সম্পর্কে খুব একটা ধারণা ছিল না স্থানীয়দের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অসাধারণ সৌন্দর্যময় এ ফুল গাছটির নাম ‘কুডজু’। লাউয়াছড়া ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে যাতায়াতকারী স্থানীয় মানুষজন দৈনন্দিন চলার পথে প্রকৃতির অপরূপ উপহার ফুটে থাকা কুডজু ফুলের মনোরম দৃশ্য দেখে বিমোহিত হন। কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে অসাধারণ এ ফুলটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নেন নিজেদের মুঠোফোনে।
 

বৃক্ষ গবেষকরা জানান, কুডজু শিম বা মটরশুঁটি পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী উদ্ভিদ। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস কিউয়ের ‘প্ল্যান্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অনলাইন’ তথ্যভান্ডার অনুযায়ী এ প্রজাতিটির আদি বিস্তৃতি এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উত্তর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত, এবং বাংলাদেশও এর স্বাভাবিক বিস্তৃতির অন্তর্ভুক্ত। এর ফুলগুলো সাধারণত লম্বা মঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে। পাপড়ির রঙ বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি হতে পারে। ফুলের ওপরের বড় পাপড়ির গোড়ায় হলুদ দাগ বা অংশ দেখা যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানে শিমজাতীয় পরিবারের এ ধরনের ফুলকে প্রজাপতি-আকৃতির 'প্যাপিলিওনেশিয়াস' ফুল বলা হয়। ফুলের পাপড়িগুলো নির্দিষ্ট বিন্যাসে থাকে এবং প্রজননের জন্য উপযোগী কাঠামো তৈরি করে। কুডজু ফুলে সাধারণত মিষ্টি সুবাসও থাকে।

কুডজু লতা ও ফুল সম্পর্কে ময়মনসিংহ মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, প্রকৃতিবিষয়ক প্রখ্যাত লেখক-গবেষক চয়ন বিকাশ ভদ্র বলেন, ‘প্রকৃতির উদ্ভিদজগতে এমন কিছু লতানো উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের বৃদ্ধি ও বিস্তারের ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। অল্প সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা সবুজে ঢেকে দিতে পারে তারা। তেমনই একটি উদ্ভিদ কুডজু। দ্রুতবর্ধনশীল এই বহুবর্ষজীবী লতা একদিকে যেমন মাটির আচ্ছাদন, পশুখাদ্য ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে অনুকূল পরিবেশে অতিরিক্ত বিস্তারের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভিদজগতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কুডজু উদ্ভিদটি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষত চীন, জাপান ও আশপাশের অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন উপপ্রজাতি ও নাম প্রচলিত রয়েছে। উদ্ভিদটি মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক, আর্দ্রতা এবং বেড়ে ওঠার উপযোগী মাটি পেলে এর লতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কুডজু একটি বহুবর্ষজীবী, দ্রুতবর্ধনশীল আরোহী লতা। এর কাণ্ড লম্বা, নমনীয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কাষ্ঠল হয়ে ওঠে। উপযুক্ত পরিবেশে লতাগুলো প্রায় ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। মাটির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্য উদ্ভিদ, গাছের কাণ্ড কিংবা অবলম্বন আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে উঠে যায়।
 

কুডজুর পাতার গঠন বেশ আকর্ষণীয়। প্রতিটি যৌগিক পাতা সাধারণত তিনটি প্রশস্ত পত্রক নিয়ে গঠিত। পত্রকগুলো ডিম্বাকার থেকে কিছুটা হৃদপিণ্ডাকৃতির হতে পারে। প্রজাতি ও পরিবেশভেদে পাতার কিনারা অখণ্ড অথবা খাঁজযুক্ত দেখা যায়। পাতার সবুজ আচ্ছাদন উদ্ভিদটিকে সহজেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এর ফুলও বেশ দৃষ্টিনন্দন; বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি রঙের প্রজাপতি-সদৃশ ফুল লম্বা পুষ্পমঞ্জরিতে ফোটে। ফুলের পর চ্যাপ্টা শুঁটির মতো ফল তৈরি হয়, যার ভেতরের বীজ অনুকূল পরিবেশে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। তবে কুডজুর বিস্তারে শুধু বীজ নয়, মাটিতে ছড়িয়ে পড়া কাণ্ড ও শিকড়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর শিকড় থেকে তৈরি স্টার্চ রান্নায় বা খাবার ঘন করতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এর লতা থেকে তৈরি আঁশ দিয়ে বস্ত্র, কাগজ ও ঝুড়ি তৈরি করা যায়।

কুডজুর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত বৃদ্ধি এবং বিস্তারের ক্ষমতা। অনুকূল পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত লতা দিনে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর বিস্তৃত শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে খাদ্য সঞ্চয় করে। মাটির সংস্পর্শে আসা কাণ্ডের গিঁট থেকেও নতুন শিকড় ও কুশি জন্মাতে পারে; ফলে একবার কোনো এলাকায় ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে উদ্ভিদটিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিম গোত্রের অন্যান্য অনেক উদ্ভিদের মতো কুডজুর শিকড়েও নাইট্রোজেন স্থিরকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সহাবস্থান দেখা যায়। এসব অণুজীব বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের ব্যবহারযোগ্য যৌগে রূপান্তরে সহায়তা করে, যার ফলে নাইট্রোজেনের স্বল্পতা রয়েছে—এমন মাটিতেও উদ্ভিদটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে পারে।
 

কুডজুর রয়েছে নানা ব্যবহারিক গুরুত্ব। অতীতে বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির ক্ষয়রোধ, অনাবাদি জমি আচ্ছাদন এবং গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদটি চাষ করা হয়েছে। এর শিকড় থেকে শ্বেতসারসমৃদ্ধ উপাদান সংগ্রহ করা হয়, যা পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। শিকড়ের গুঁড়া ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন পানীয় ও খাদ্যেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এর ঘন পাতার আচ্ছাদন ছোট গাছ, গুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদের ওপর আলো পৌঁছাতে বাধা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ঢেকে রাখলে অনেক উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, এমনকি সেগুলো মারাও যেতে পারে। ফলে স্থানীয় উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যুক্তরাষ্ট্রে কুডজুর ব্যাপক বিস্তার এ বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।’
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত